মা ও তিন মেয়ে খুন

ঘাতকের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিল কিশোর সিফাত  

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৯ জুন ২০২৬, ০০:১৭

‘ঘাতক প্রায় এক বছর আগে এ ভবনের ৪র্থ তলায় এক মেয়ের সঙ্গে থাকত। আমরা জানতাম ঘাতক ও তার স্ত্রী মুসলিম। তারা নামাজও পড়ত। ঘাতকের মাথায় টুপিও থাকত, তার স্ত্রী পরিচয়ে মেয়েটি মাঝে মাঝে বোরকাও পড়ত; কিন্তু মা ও বোনদের হত্যার পর অন্তর মজুমদার নাম শুনেই আমি হতবাক।’
দা দিয়ে মা ও  তিন বোনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার পর কিশোর জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত এসব কথা বলেন।
‘জীবনে একা চলতে শেখা দরকার…’—গত ২৯ মে নিজের ফেসবুক আইডিতে এ কথা লিখেছিল কিশোর জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৮)। এক মাসের ব্যবধানে সে কথাই যেন নির্মম বাস্তবতা হয়ে সামনে এলো সিফাতের জীবনে।
এদিকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও ঘাতকদের গ্রেফতারের দাবিতে রোববার (২৮ জুন) বিকাল সাড়ে ৫টার সময় রায়পুর ট্রাফিক মোড়ে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেন রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির শিক্ষক,  শিক্ষার্থী ও ছাত্র সমাজের লোকজন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল ৮টা লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সিফাতের মা এবং স্কুল ও কলেজ পড়ুয়া তিন বোনকে। পরিবারটিতে কেবল বেঁচে রয়েছে তরুণ সিফাত। সিফাতের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে।
শুক্রবার রাত ১০টায় গ্রামটির মেঘনা নদীর পাড়ে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয় সিফাতের মা ও তিন বোনকে। দাফন শেষে গ্রামের বাড়িতেই অবস্থান করছে সিফাত।
রোববার বিকালে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ফিরে এলে তার সঙ্গে কথা হলে তিনি এসব কথা জানান।
খুনের ঘটনার পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
অন্তর মজুমদার নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার ছারামন উল্লাহ ইউনিয়নের চর ফজলুল করিম গ্রামের সুজিৎ মজুমদার ও আম্পরি মজুমদারের ছেলে। এছাড়াও অন্তর তার এলাকায় কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে খারাপ আচরণের কারণে গ্রাম ও পরিবার থেকে বিতাড়িত। সে ইসকনের সদস্য ও বিবাহিত ছিল বলে চাচাতো ভাই টিটু মজুমদার মোবাইলে জানান।
ফেসবুকে দেওয়া নিজের সেই স্ট্যাটাসের প্রসঙ্গে তুলে রোববার বিকালে সিফাত বলেন- ‘কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই কথাগুলো লিখেছিলাম। তখনো ভাবিনি, একদিন আমার জীবনের সঙ্গে এটি কাকতালীয়ভাবে মিলে যাবে। এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই আমি একা হয়ে গেছি।’
তিনি বলেন, ‘আমি বাসার পাশে যে দোকানে চাকরি করি, সেখান থেকে ছুটে এসে বাসায় ঢুকতেই দেখি আমার মা রান্নাঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। পাশের কক্ষে তিন বোনের রক্তাক্ত দেহ। পুরো ঘর রক্তে ভেসে গিয়েছিল। সেই দৃশ্য আমি কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না।’
অন্তর মজুমদারের বিষয়ে সিফাত বলেন- ‘অন্তর একসময় আমাদের ভবনের ওপরের তলায় ভাড়া থাকত। সেই কারণে দু-একবার কথা হয়েছে। এর বাইরে তার সঙ্গে আমাদের কোনো ঘনিষ্ঠতা বা বিরোধ ছিল না। মা ও তিন বোনকে হত্যার ঘটনায় অন্তরের নাম শুনে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। কেন সে এমন ঘটনা ঘটাবে, তা এখনো বুঝতে পারছি না।’
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি ধারাল ছেনি (ধারাল অস্ত্র) আলামত হিসেবে জব্দ করেছে।
সিফাতের দাবি, ওই ধারালো অস্ত্র তাদের বাসার নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসায় কোনো ছেনি ছিল না। আমার ধারণা, অন্তর হত্যার উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।’ ‘প্রতিদিন সকাল ৭-৮টার মধ্যেই আমি কাজে বের হওয়ার সময় ছোট বোন সিপাও আমার সঙ্গে বের হতো। আমি তাকে স্কুলের সামনে নামিয়ে দিতাম। সেদিনও সকাল ৮টার দিকে বের হওয়ার সময় তাকে ডাকি; কিন্তু ও তখন ঘুমিয়ে ছিল। তাই আর না ডেকে বাসায় রেখেই চলে আসি। কে জানত, এটাই ওকে শেষবারের মতো দেখা হবে।’
বৃহস্পতিবার রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনাটি ঘটে। এতে নিহত হন শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তার তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২০), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ফাতেমা আক্তার সিপা (৯)।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ২৫ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে কুমিল্লা থেকে পরিবার নিয়ে রায়পুরে এসেছিলেন সিফাতের বাবা কামাল হোসেন। ২০১৯ সালে রমজানের সময়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান কামাল। সেই থেকে শাহিনুর বেগমই সংসারের খরচ চালিয়ে আসছিলেন। কিছুদিন আগে সিফাত একটি রড-সিমেন্ট বিক্রির দোকানে চাকরি নেন।
রায়পুর থানার ওসি শাহীন মিয়া বলেন, মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে পুলিশ। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় নিহতদের ছেলে জিহাদুল ইসলাম শিফাত বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের নামে হত্যা মামলা এবং অভিযুক্তকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যায় ও এ সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে ৭ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ দুটি হত্যা মামলাই তদন্ত করছেন পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান।
শনিবার রাতে সিফাতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেন কুমিল্লা-২ আসনের (হোমনা-তিতাস) সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। এছাড়াও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর একাংশ) আসনের এমপি আবুল খায়ের ভুঁইয়া। এ সময় সিফাতকে কুমিল্লায় ফিরিয়ে নিয়ে এসে তার লেখাপড়াসহ সার্বিক খরচের দায়িত্ব নিতে চান বলে জানান সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, মা ও তিন বোন নিহত হওয়ার পর লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বসবাস সিফাতের জন্য নিরাপদ নয়।
সিফাতকে পৈতৃক সম্পত্তি দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তার চাচা ও গ্রামবাসীকে অনুরোধ জানান এমপি। লক্ষ্মীপুরের জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে হত্যাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করার তাগিদও দেন তিনি।