রংপুরে চার খুন

এবার পুলিশ ও চিকিৎসকের বক্তব্যে অমিল, তদন্ত কোন পথে?

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৫ আগস্ট ২০২৬, ২২:৫৯

mcরংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিশিষ্টজনরা। তাদের অভিযোগ, দুই যুবককে গ্রেফতার করে চার হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে পুলিশ। এটিকে ‘সাজানো নাটক’ বলে দাবি করেছেন তারা।
হত্যার নেপথ্য কারণ হিসেবে পুলিশ প্রথমে ধারণা করেছিল, এটা ডাকাতি। তবে রবিবার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা করা হয় তাদের। পুলিশের এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই শিক্ষকের স্বজনরা।
আবার মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল যে, নিহতদের মুখমণ্ডল বিকৃত ছিল এবং সেখানে তরল পদার্থ পাওয়ায় কোনও রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মরদেহে কোনও রাসায়নিক বা অ্যাসিড বার্নের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মরদেহগুলো বেশ কিছু সময় ধরে পড়ে থাকায় রক্ত ও টিস্যুর পরিবর্তনের কারণে স্বাভাবিক পচন প্রক্রিয়ায় মুখ কালচে ও বীভৎস দেখিয়েছে।
এ অবস্থায় চার খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন, প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের দাবিতে সোমবার রংপুর নগরীতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদ ও রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে তিন দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা না হলে রংপুর নগরী অচল করে দেওয়া হবে।
কীভাবে মিলে গেলো পুলিশ কর্মকর্তা ও আসামির শার্ট?কীভাবে মিলে গেলো পুলিশ কর্মকর্তা ও আসামির শার্ট?
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চার জনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা হলেন- রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৩)। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে রবিবার ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর রবিবার বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।
পুলিশের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ রবিবার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় বাধা দেওয়ায় ওই দুই যুবক চার জনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তারা ওই বাসায় গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে শসা ও খেজুর বের করে খান এবং নিজেদের ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন পানিতে ডিটারজেন্ট দিয়ে নষ্ট করে দেন। পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় পর্যন্ত তারা ওই বাসায় অবস্থান করেন।
পুলিশের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশিষ্টজনরা। তাদের দাবি, দুই যুবক কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একই পরিবারের চার জনকে হত্যা করে দীর্ঘ সময় বাড়িতে অবস্থান করার যে গল্প পুলিশ বলেছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটি নাটক।
পুলিশের গল্প কেউ বিশ্বাস করে না
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে রংপুর জিলা স্কুল থেকে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্কুলের সামনে যায়। পরে সেখানে মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থীরা নগরীর কাছারি বাজার এলাকার প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ চলায় সড়কের দুই পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সমাবেশে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, ‘দুদিন তাদের লাশ বাড়িতে পড়ে ছিল। এরপর শনিবার রাতে পুলিশ উদ্ধার করে। পরে হঠাৎ শুনলাম, হত্যায় জড়িত দুই যুবক মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে আটক করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার বলেছেন, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। দুই মাদকসেবী পরপর চার জনকে হত্যা করেছে—পুলিশের এমন গল্প পাগলেও বিশ্বাস করবে না। চার জনকে হত্যার পর তারা ওই বাড়িতে গোসল করেছেন, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খেয়েছেন এবং মোবাইল ফোন নষ্ট করে ফেলছেন—এসব বক্তব্যও আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।’

শফিয়ার রহমান প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে তা বের করা এবং প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের দাবি জানান।

ময়নাতদন্তের বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন

সমাবেশে সাবেক শিক্ষার্থী শরিফুল বলেন, ‘পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য আমরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছি না। পুলিশ কমিশনার গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধের সময় তার চোয়াল ভেঙে যাওয়া ও চোখ বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্য এর সঙ্গে মেলে না। পুলিশের বক্তব্য ও চিকিৎসকের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে পুলিশের বক্তব্য কীভাবে বিশ্বাস করবো আমরা?’
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল বা চোখ বের হয়নি। তবে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। ফরেনসিক রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর মূল কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এ ছাড়া চার জনের মুখ বা শরীরে অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার কোনও আলামত পাওয়া যায়নি ময়নাতদন্তে।’নমিে
তিন দিনের মধ্যে রহস্য উদঘাটন করতে হবে
সমাবেশে সাবেক শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মী ডলার বলেন, ‘আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং তার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানসহ চার জনকে দুই যুবক মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা করেছে—পুলিশ কমিশনারের এই বক্তব্য আমরা বিশ্বাস করি না। তিন দিনের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা না হলে রংপুর নগরী পুরোপুরি অচল করে দেওয়া হবে।’
মহিলা পরিষদের প্রতিবাদ
একই দাবিতে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি রুমানা জামান বলেন, ‘চার খুনের ঘটনায় পুলিশ যে গল্প বানিয়েছে, চিত্রনাট্য ভালো; তবে গল্পটি একেবারেই পছন্দ করেনি মানুষ। পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আমরা কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না।’ দুই ব্যক্তি অল্প সময়ের মধ্যে চার জনকে হত্যা করেছেন—এমন ঘটনা বাস্তবে কতটা সম্ভব, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। রুমানা জামান দ্রুত প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান।
একই দাবিতে বিকেলে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটি। সমাবেশে নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমাদের।’
তিনি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান।
পুলিশের বক্তব্য চিকিৎসকের সঙ্গে পার্থক্য
রবিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ নিহত প্রার্থী চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধ করার সময় তার চোয়াল ভেঙে যাওয়া ও চোখ বের হয়ে যাওয়ার কথা জানান। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, ‘মেয়েটির চোয়াল ও চোখ বের হয়নি। তবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর মূল কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। এ ছাড়া চার জনের মুখ বা শরীরে অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়ার কোনও আলামত পাওয়া যায়নি।’
এদিকে পুলিশ দুই যুবককে গ্রেফতার করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা বললেও, আন্দোলনকারীরা পুলিশের এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে প্রকৃত ঘটনা, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
তদন্ত কোন পথে?
এরই মধ্যে চার খুনের মামলাটি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। অধিকতর তদন্ত করে অভিযোগপত্র দেওয়ার লক্ষ্যে এ পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি সোমবার সন্ধ্যায় জেলার ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে মামলার নথিপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নতুন তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করেন। মামলাটির নতুন তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে। পরে পুরোনো ও নতুন তদন্ত কর্মকর্তা দুজনই মাছুয়াপাড়ায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পরিদর্শন করেন। এ সময় আগের তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল ও মামলার তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নতুন তদন্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।
ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘মামলাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্তের জন্য ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। রংপুরের পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সঙ্গে আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির মিল আছে। তবে কিছু বিষয়ে আসামিরা নতুন তথ্যও দিয়েছেন। ফলে মামলার তদন্তভার পুলিশের কাছ থেকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।মে