গ্রিন কার্ড পেতে অধিকাংশ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে না

ডিএইচএস
ডেস্ক রিপোর্ট
  ৩০ মে ২০২৬, ২৩:৪৬


যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অভিবাসীদের নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে—গত সপ্তাহে দেওয়া এমন একটি ঘোষণাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস)।
শুক্রবার (২৯ মে) বিভাগটি জানায়, নীতিতে আসলে বড় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তাদের দাবি, কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রেই গ্রিন কার্ডপ্রত্যাশীদের যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে হবে।
বিতর্কের সূত্রপাত গত সপ্তাহে। তখন ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছিল, গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীদের দেশে ফিরে যেতে হবে। শুধু ‘বিশেষ’ পরিস্থিতিতেই তারা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে পারবেন।
এই ঘোষণাই প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে এমন একটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যার আওতায় অনেক গ্রিন কার্ড আবেদনকারী দেশেই থেকে তাদের আবেদনের অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন।
সে কারণেই শুক্রবার ডিএইচএসের ব্যাখ্যাকে অনেকেই গত সপ্তাহের ঘোষণার তুলনায় অবস্থান নরম করার চেষ্টা, কিংবা আংশিক পিছু হটা হিসেবে দেখছেন।
শুক্রবার ডিএইচএস জানায়, এটি কোনো ঢালাও পরিবর্তন নয়। একজন আবেদনকারীকে গ্রিন কার্ডের জন্য আমেরিকার বাইরে যেতে বাধ্য করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর। তারা জানায়, ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের ক্ষমতা রয়েছে।
ডিএইচএসের একজন মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটি ছিল কেবল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের তাদের ক্ষমতা সম্পর্কে মনে করিয়ে দেওয়া, যা সব সময়ই ঘটনাভেদে (কেস-বাই-কেস) বিদ্যমান ছিল।’ 
তিনি ইঙ্গিত দেন যে যারা ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করছেন বা যেসব দেশের নাগরিকরা মার্কিন সরকারি সুবিধা অধিক ব্যবহার করেন, মূলত তারাই এক্ষেত্রে ভুগতে পারেন।
এটি গত সপ্তাহের ঘোষণার তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন হলেও, এ নিয়ে বিভ্রান্তি বা ভয় কমার সম্ভাবনা কম। কারণ, ঠিক কারা এবং কীভাবে প্রভাবিত হবেন, সে বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। এমনকি এই পরিবর্তনের বিষয়টি যখন প্রথম প্রচার করা হয়, তখন ডিএইচএসের ভেতরের অনেক কর্মকর্তাই এর পরিধি নিয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন।

কী বলছেন আইনজীবীরা?
কিছু ইমিগ্রেশন আইনজীবী জানিয়েছেন, ইউএসসিআইএস কর্মকর্তারা চলতি সপ্তাহেই তাদের মক্কেলদের সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞাসা করেছেন যে তারা কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করছেন এবং তাদের নিজ দেশে আবেদন করতে কোনো বাধা আছে কি না।
থার্ড ওয়ে নামের একটি মধ্য-বামপন্থী গ্রুপের সামাজিক নীতিবিষয়ক প্রধান এবং সাবেক ইউএসসিআইএস কর্মকর্তা সারাহ পিয়ার্স বলেন, ‘মানুষের ক্ষোভের কারণেই প্রশাসন বাধ্য হয়ে নিজেদের তৈরি করা জট পাকাতে মাঠে নেমেছে।’
তিনি আরও বলেন, এই প্রশাসনের অভিবাসন নীতির ‘মূল বৈশিষ্ট্য’ই হলো—‘দেশের জন্য কী ভালো, তার চেয়ে হঠাৎ চমকে দেওয়া এবং ভয় দেখানোর ওপর বেশি জোর দেওয়া।’
এ বিষয়ক প্রথম ঘোষণার পরপরই ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ইমিগ্রেশন আইনজীবীরা ধারণা করেছিলেন যে এটি আইনি বাধার মুখে পড়বে, তবে অস্পষ্ট নির্দেশনার কারণে কীভাবে আইনি পথে এগোবেন, তা নিয়ে তারা এখনো ভাবছেন।
আমেরিকান ইমিগ্রেশন লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক বেঞ্জামিন জনসন বলেন, ‘যখন আপনি জানেনই না বিষয়টি আসলে কী, তখন এর বিরুদ্ধে মামলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। আদালতে কীভাবে এটি সবচেয়ে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা বলার সময় এখনো আসেনি।’
কিছু ব্যবসায়ী সংগঠনও এই নীতিগত পরিবর্তনের সমালোচনা করেছে। ইউএস চেম্বার অব কমার্সের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট নীল ব্র্যাডলি অবৈধ অভিবাসী কমানোর উদ্যোগের প্রশংসা করেও বলেন, নীতিনির্ধারকদের একটি ‘আরও শক্তিশালী’ আইনি অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত। তবে তিনি সতর্ক করেন যে এই নীতিগত পরিবর্তন ‘নিয়োগকর্তাদের জন্য চরম বিপর্যয়কর’ হতে পারে।

গ্রিন কার্ডের প্রক্রিয়া
২০২৪ সালে প্রায় ১৪ লাখ গ্রিন কার্ড দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার অনুমোদিত হয়েছিল ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ায় প্রবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেই গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন। অনেকেই নিয়োগকর্তা বা স্বামী/স্ত্রীর মতো নিকটাত্মীয়ের স্পনসরশিপের মাধ্যমে এটি করেন।
মার্কিন নাগরিকদের নির্দিষ্ট কিছু পারিবারিক সদস্য, বিভিন্ন ক্যাটাগরির বিদেশি কর্মী এবং শরণার্থীসহ মানবিক কর্মসূচির আওতায় মর্যাদা পাওয়া ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পেতে পারেন। স্থায়ী বাসিন্দার এই মর্যাদা বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার আগে আবেদনকারীদের কড়া যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং অনুমোদনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর তা নির্দিষ্ট সময় পর পর নবায়ন করতে হয় এবং পরবর্তীতে তারা নাগরিকত্বের জন্যও আবেদন করতে পারেন।
গত সপ্তাহে ঘোষিত নতুন এই নির্দেশনার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে পারিবারিক স্পনসরের মাধ্যমে আবেদন করা অভিবাসীদের ওপর। কারণ, আমেরিকায় বসবাস বা কাজ করার জন্য তাদের কাছে সাধারণত কোনো ব্যবসায়িক বা ওয়ার্ক ভিসা থাকে না।
গত কয়েক দশক ধরে অনেক অভিবাসীই সাময়িক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে মার্কিন নাগরিকদের বিয়ে করেছিলেন। কার্যত তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও গ্রিন কার্ডের আবেদন চলাকালীন তাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো। তবে এখন যদি তাদের জোর করে দেশে ফেরত পাঠিয়ে সেখান থেকে আবেদন করতে বলা হয়, তবে ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া অনেককেই আর যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হবে না। 
বাইডেন প্রশাসনের সময়কার ইউএসসিআইএস জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডগ র‍্যান্ড বলেন, ‘এটা খুব স্পষ্ট যে তারা এই দিকটাতেই আঘাত হানতে চাইছেন। কারণ, যদি এখন হঠাৎ করে আপনি আপনার স্ট্যাটাস সমন্বয় করতে না পারেন এবং আপনাকে দেশে ফিরে যেতে হয়, তবে আপনি তো ফাঁদে পড়ে গেলেন। আপনাকে আগামী ১০ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিরতে দেওয়া হবে না।’

উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের ভবিষ্যৎ 
প্রথম নির্দেশনার ভাষা এমন ছিল যে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের এইচ-১বি এবং অন্যান্য ভিসায় থাকা উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি কর্মীদের নিয়ে শঙ্কায় পড়ে যায়। এদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন। দেশে ফিরে গিয়ে আবার আসার বিষয়টি এই অপেক্ষাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, কারণ অনেক কনস্যুলেটেই সাক্ষাৎকারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এ ছাড়া কনস্যুলার কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণত আপিল করা যায় না এবং আবেদনকারীরা সাধারণত সাক্ষাৎকারের সময় কোনো আইনজীবী রাখতে পারেন না।
উলফসডর্ফ রোসেনথাল ল ফার্মের ম্যানেজিং পার্টনার বার্নার্ড উলফসডর্ফ বলেন, ‘নিয়োগকর্তারা এ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। প্রযুক্তির দিক দিয়ে আমেরিকার এগিয়ে থাকার পেছনে মূলত এরাই কাজ করছে, অথচ এখন তাদেরকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে।’
এই নির্দেশনার ফলে আরেকটি প্রশ্নও রয়ে গেছে—যেসব দেশের ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত রাখা হয়েছে, তাদের নাগরিকদেরও গ্রিন কার্ডের জন্য দেশে ফিরে যেতে হবে কি না এবং ঠিক কী কারণে একজন আবেদনকারী ‘জাতীয় স্বার্থের’ ভিত্তিতে ছাড় পাবেন, তা পরিষ্কার নয়। 
ট্রাম্পের অন্যান্য অভিবাসন নীতির সঙ্গে মিলে এই বিভ্রান্তিকর নির্দেশনা হয়তো অনেক মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার চেষ্টা থেকেই বিরত রাখবে। চাকরি খোঁজার প্ল্যাটফর্ম 'ইন্ডিড'-এর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চাকরিতে বিদেশি চাকরিপ্রার্থীদের আগ্রহ ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
স্ল্যাটন অ্যান্ড হাস-এর ম্যানেজিং পার্টনার ভিক্টোরিয়া স্ল্যাটন বলেন, ‘এটি যে পরিমাণ প্যানিক বা আতঙ্ক তৈরি করেছে, তা পাগলামির পর্যায়ে চলে গেছে। যদি এই মেমোর উদ্দেশ্য মানুষকে ভয় দেখিয়ে আবেদন করা থেকে বিরত রাখা হয়, তবে এটি বেশ ভালোভাবেই সেই কাজ করছে।’