একটি করমর্দন, পাকিস্তান–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যতে বহু প্রশ্ন

জিও টিভির প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:৪৭

দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক এক অপ্রত্যাশিত করমর্দন পাকিস্তান–ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। গত বছরের মে মাসে চার দিনের সামরিক সংঘর্ষের পর সম্পর্ক যখন তলানিতে নেমে গিয়েছিল, তখন এই ঘটনাকে কেউ কেউ সীমিত হলেও সম্পর্কের বরফ গলার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে অংশ নিতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে করমর্দন করেন।
পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওই সময় জয়শঙ্কর স্পিকার সাদিকের কাছে নিজের পরিচয় দেন এবং জানান যে তিনি তাকে (সাদিককে) চিনতে পেরেছেন।
যদিও করমর্দনটি কূটনৈতিক রীতির মধ্যেই পড়ে, তবুও মে ২০২৫ সালের সংঘাতের পর ভারতের পক্ষ থেকে এটিই ছিল প্রথম উল্লেখযোগ্য উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। এই সংঘাতের সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের এপ্রিলে যখন ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে ২৬ জন পর্যটক সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। এই ঘটনার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করে।
দিল্লি কোনো প্রমাণ ছাড়াই ওই হামলার পেছনে ইসলামাবাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে। পাকিস্তান তা অস্বীকার করে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়।
পেহেলগাম হামলার পর দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে তীব্র সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়। পাকিস্তান দাবি করে, তারা ফরাসি নির্মিত রাফালসহ সাতটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
৮৭ ঘণ্টা স্থায়ী এই সংঘাত ২০২৫ সালের ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়।

‘জয়শঙ্কর-সাদিকের করমর্দন হঠাৎ, পরিকল্পিত নয়’
জিও টিভিকে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেন, এই করমর্দনের বিশেষ কোনো তাৎপর্য নেই। তার ভাষায়, এটি ছিল ‘হঠাৎ, পরিকল্পিত বা কোরিওগ্রাফ করা কোনো ঘটনা নয়।’
তিনি বলেন, ‘এটি জমাট বাঁধা ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক ভাঙার কোনো সূচনা নয়। ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ পুনরায় শুরুর আগ্রহ দেখায়নি এবং ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক বক্তব্য অব্যাহত রেখেছে।’
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সিনেটর ও সাবেক রাষ্ট্রদূত শেরি রহমানও লোধির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না এটি পরিকল্পিত কোনো ইঙ্গিত ছিল। বিষয়টিকে অযথা বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
জিও টিভিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, এক্সে দেওয়া তার পোস্টে তিনি সাদিক ও জয়শঙ্করের করমর্দনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, কারণ রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে ন্যূনতম কূটনৈতিক সৌজন্য বজায় থাকা সবসময়ই ইতিবাচক।
তিনি বলেন, ‘প্রকৃত রাষ্ট্রীয়-সম্পর্কের পরীক্ষা হবে ২০২৫ সালের ১০ মে’র পর ভারত যে ন্যূনতম কূটনৈতিক প্রোটোকল ও চুক্তিগুলো স্থগিত করেছে, সেগুলো পুনরায় চালুর জন্য পাকিস্তানের দিকে হাত বাড়ানো।’
পেহেলগাম হামলার পর ভারত একাধিক উত্তেজনাকর পদক্ষেপ নেয়, যার মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ৬৫ বছর পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি (আইডব্লিউটি) স্থগিত রাখাও রয়েছে।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তি সিন্ধু নদী ও তার উপনদীগুলোর পানি বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর থেকে ভারত যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে, ইসলামাবাদ সেগুলোকে ‘পানি সন্ত্রাস’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
শেরি রহমান বলেন, ‘একটি যুক্তিবাদী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তান যেকোনো স্বাভাবিকীকরণের উদ্যোগে সাড়া দেবে, যেমনটি যুদ্ধের ক্ষেত্রেও দিয়েছে। দিল্লির এতদিনে বোঝা উচিত, ভূগোল বদলানো যায় না, পাকিস্তানের সীমান্তও নয়।’

‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার’
ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান জিও টিভিকে বলেন, দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এই করমর্দন মূলত প্রোটোকলের বিষয়।
তিনি বলেন, ‘দুজনই একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে ছিলেন। এমন গম্ভীর পরিবেশে একে অপরকে এড়িয়ে যাওয়ার চেয়ে সংক্ষিপ্ত করমর্দনই যুক্তিসংগত।’
তার মতে, এটিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ভারতীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কুগেলম্যান বলেন, ‘নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট—আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে আলোচনা না হলে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপে যাবে না, যা ইসলামাবাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।’
তিনি আরও বলেন, অপারেশন সিন্দুরের পর ভারতের বক্তব্যে বোঝা যায়, উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি, যা এমন কোনো উদ্যোগকে অসম্ভব করে তোলে।
কুগেলম্যানের মতে, ভারত যদি সত্যিই সম্পর্ক উন্নয়নের সংকেত দিতে চাইত, তাহলে তারা ভিন্ন মর্যাদার দুই নেতার প্রকাশ্য করমর্দনের বদলে গোপন কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করত।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এটি নীতিগত কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই একবারের জন্য হওয়া স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা বলেই মনে হয়।’
জয়শঙ্করের করমর্দনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, করমর্দন এড়িয়ে গেলে দিল্লির জন্য তা বিতর্ক তৈরি করতে পারত। 
তিনি বলেন, ‘তৃতীয় দেশে একটি রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা টেনে আনা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হতো।’

‘ইতিবাচক ইঙ্গিত’
তবে পাকিস্তানের সাবেক সিনেটর মুশাহিদ হুসেন সৈয়দ এই করমর্দনকে ভারতের পক্ষ থেকে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘ডা. জয়শঙ্করের মুখে হালকা হাসিও ছিল।’
বাংলাদেশ সফরের বার্তা বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, এটি ছিল ‘টু ইন ওয়ান’ বার্তা। ‘পাকিস্তানের জন্য—হাত না মেলানোর পুরোনো নীতি ছিল তুচ্ছ এবং ভুল, তাই তারা কূটনৈতিক শালীনতায় ফিরেছে। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত এখন আর শুধু আওয়ামী লীগের প্রতি একতরফা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।’
তার মতে, একটি করমর্দনই সম্পর্ক জোড়া লাগানোর সংকেত না হলেও, ২০২৬ সাল পাকিস্তান–ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সূচনা হতে পারে।
তিনি দাবি করেন, এই করমর্দন পরিকল্পিত ছিল, কারণ ‘শারীরিক ভঙ্গির সঙ্গে ইতিবাচক দেহভাষাও ছিল, যা পরিকল্পনারই ইঙ্গিত দেয়।’
ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনার প্রভাব খেলাধুলাতেও পড়েছিল। ভারতীয় পুরুষ, নারী ও অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলও পাকিস্তানের বিপক্ষে করমর্দনে অস্বীকৃতি জানায়।
মুশাহিদ হুসেন বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ভারতীয়রা তাদের ভুল বুঝেছে এবং এখন তা সংশোধনের চেষ্টা করছে।’
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৫৪ সালে জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাইয়ের সঙ্গে করমর্দন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সেই ভুল সংশোধনে যুক্তরাষ্ট্রের লেগেছিল ১৭ বছর।