
গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের সুরক্ষা দেওয়াই সংবাদমাধ্যমের প্রধান কাজ। তবে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবাদিকদের ওপর নানা প্রকার নিপীড়ন ও মামলার ঘটনায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা এই অচলাবস্থা কাটাতে এবং ‘মিথ্যা মামলায়’ কারাবন্দি সাংবাদিকদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের পরিসংখ্যান
নিপীড়নবিরোধী সাংবাদিক ফ্রন্টের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সারাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচ শতাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অর্ধশত সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময়ে ১৩ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হারিয়েছেন। এছাড়া প্রায় এক হাজার ২০০ সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং ১৬৮ জনের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রেস ক্লাবের সাত শতাধিক সাংবাদিকের সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি অর্ধশতাধিক সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির অভিযোগও উঠেছে।
কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন
ফ্রন্টের সদস্য সচিব শেখ জামাল জানান, মিথ্যা মামলায় যেসব সাংবাদিকরা কারাগারে আছেন তারা কেউই ভালো নেই। তারা ভীষণ অসুস্থ।
তিনি অভিযোগ করেন, “কারাগারে তাদের জন্য উপযুক্ত খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। কেমিক্যাল মিশ্রিত খাবার দেওয়া হয়। যারা কারাগার থেকে বের হচ্ছেন তাদের ব্লাড, ইউরিন, কিডনি, লিভারে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। আমি নিজেও মিথ্যা মামলায় কারাবরণ করে এই ধরনের রোগের সম্মুখীন হয়েছি। যারা কারাগারে যায় তারা অসুস্থ হয়ে ফিরে আসছে।”
সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপাসহ আরও অনেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং তাদের জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন বলেও তিনি জানান।
আইনি জটিলতা ও মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস অর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ বলেন, “আইনি বাধা, বর্তমান সিস্টেম এবং পেশাগত ব্যর্থতার কারণে কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি মিলছে না।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “গণমাধ্যমকর্মী এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান একে অপরের পরিপূরক। সংবাদকর্মীকে বাদ দিলে গণমাধ্যম কিভাবে কাজ করে?” গণমাধ্যম মুক্ত আছে কি না— সেই প্রশ্নও রাখেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
হতাশা ব্যক্ত করে মনজিল মোরসেদ বলেন, “এখনও আমাদের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। এখনও কিছু সংবাদকর্মী নির্দিষ্ট মোটিভ নিয়ে, কাউকে খুশি করার জন্য কাজ করে চলেছেন। এগুলো স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য ভালো নয়।”
তিনি বলেন, “রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কোনও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে, তবে হত্যা মামলাসহ যেসব গুরুতর অভিযোগে তাদের আটকে রাখা হয়েছে, তা বিচারিক মানদণ্ডে কতটুকু টিকবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সারাদেশের ২০ কোটি মানুষ জানে যে, এসব অভিযোগ কিছুই না।”
বর্তমান পরিস্থিতি
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত শাকিল আহমেদ, ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল হক বাবু, শ্যামল দত্ত এবং ২০২৫ সালে মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথীসহ প্রায় শতাধিক সাংবাদিক হত্যা-চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগে কারাগারে আছেন।
এমনকি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৩২ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আপিল আবেদনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে আদালত থেকে জামিন পেলেও তাদের কারামুক্তি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যদিও ইতোমধ্যে শওকত মাহমুদ, মঞ্জুরুল আলম পান্না, শেখ জামাল ও আনিস আলমগীরসহসহ কয়েকজন সাংবাদিক কারামুক্ত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিক্রিয়া
মুক্ত গণমাধ্যম নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিকদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ)। এছাড়া সম্পাদক পরিষদ এবং দেশের ৬৩ জন বিশিষ্ট নাগরিক সাংবাদিকদের নির্বিচারে আটক ও বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মুক্ত গণমাধ্যমের দাবি
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিক সমাজ ও সংশ্লিষ্টরা বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে— অবিলম্বে কারাবন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; সাংবাদিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করা; চাকরিচ্যুতদের চাকরিতে পুনর্বহাল; ডিইউজে ও বিএফইউজে’র তালাবদ্ধ অফিস খুলে দেওয়া; অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ও প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া; ব্যাংক হিসাব ও দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
সাংবাদিক শেখ জামালের মতে, এসব পদক্ষেপ না নেওয়া হলে দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন