
যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) পুশইনের আশঙ্কা কমলেও সীমান্তজুড়ে এখনো বিরাজ করছে সতর্কতা, উৎকণ্ঠা ও চাপা উত্তেজনা।
গত কয়েকদিনে নতুন করে কোনো পুশইনের ঘটনা না ঘটলেও সীমান্তের ওপারে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সম্ভাব্য যেকোনো পুশইন বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বেনাপোল সীমান্তে আগের তুলনায় প্রায় দিগুণ বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল, নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে বেনাপোলের সাদিপুর, দৌলতপুর, পুটখালী, কাগজপুকুর, ঘিবা ও সীমান্তঘেঁষা বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিজিবি সদস্যরা সার্বক্ষণিক টহল ও নজরদারিতে নিয়োজিত রয়েছেন। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি রাতের টহলও বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যেও সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই স্বেচ্ছায় বিজিবিকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ মে গভীর রাতে বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। এর আগে সীমান্তের ওপারে প্রায় ১০০ থেকে ১২০ জন লোককে জড়ো করা হয়েছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য পায় বিজিবি। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বিজিবি দ্রুত সীমান্তে অবস্থান নিয়ে পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করে। ফলে ওই ব্যক্তিরা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করতে বাধ্য হয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুই দিন ধরে নারী, শিশু ও পুরুষদের একটি দল সীমান্তের শূন্যরেখায় মানবেতর জীবনযাপন করে। প্রচণ্ড গরম, বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা দিন কাটায়। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে নারী ও শিশুরা। পরে ২ জুন রাতের দিকে বিএসএফ তাদের শূন্যরেখা থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান।
ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পুশইনের আশঙ্কায় সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজিবির পাশে এসে দাঁড়ায়। স্থানীয় বাসিন্দারা রাত জেগে সীমান্ত পাহারায় অংশ নেন এবং যেকোনো সন্দেহজনক তৎপরতার তথ্য বিজিবিকে জানান।
সাদিপুর গ্রামের বাসিন্দা সাগর হোসেন বলেন, ১ জুন সকালে জানতে পারি বিজিবি পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করেছে। এরপর গ্রামের মানুষ নিজের উদ্যোগেই সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেয়। আমরা বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে রাত জেগে পাহারা দিয়েছি। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সবাই সতর্ক রয়েছে।
একই গ্রামের জসিম উদ্দিন বলেন, সীমান্ত রক্ষা শুধু বিজিবির দায়িত্ব নয়, দেশের নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে। তাই আমরা সীমান্তে অবস্থান নিয়ে বিজিবিকে সহযোগিতা করেছি। ভবিষ্যতেও দেশের স্বার্থে আমরা তাদের পাশে থাকব।
বেনাপোল বাজারের ব্যবসায়ী পলাশ আহমেদ বলেন, পুশইনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তবে বিজিবির দৃঢ় অবস্থান এবং দ্রুত পদক্ষেপের কারণে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি।
আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কাউকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়। বিজিবি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় থাকা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনার পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গত ৩ জুন সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি স্থানীয় জনগণ ও বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করে দেশের সীমান্ত সুরক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মে রাতে বিএসএফ সীমান্তের বিভিন্ন স্থানের আলো নিভিয়ে শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে ‘বাংলাদেশি’ দাবি করে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালায়। তবে বিজিবির কঠোর অবস্থান, বাড়তি সতর্কতা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
বেনাপোল চেকপোস্ট আইসিপি ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার মিজান হোসেন বলেন, আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, সীমান্তের ওপারে বিএসএফের বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে বিপুলসংখ্যক মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেককে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হতে পারে। এ কারণে সদর দপ্তরের নির্দেশনায় সীমান্তে আগের তুলনায় প্রায় দিগুণ বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম।
তিনি আরও বলেন, সীমান্তে কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বেনাপোল সীমান্তে পুশইনের কোনো ঘটনা ঘটছে না। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছি এবং সীমান্তজুড়ে নিয়মিত টহল অব্যাহত রেখেছি।
তিনি বলেন, যাদের পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল তারা বাংলাদেশি কিনা, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কেউ যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি হয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক আলোচনা এবং প্রচলিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে দেশে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। কিন্তু রাতের আঁধারে বা একতরফাভাবে কাউকে সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানোর কোনো বৈধতা নেই।