বেরোবি ক্যাম্পাস ছাত্রদলের দখলে

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবিতে জুতা নিক্ষেপ

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:৩২

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে শিবিরের ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ আয়োজিত আলোকচিত্র প্রদর্শনী নিয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের সোমবার রাতে সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় শিবিরের পক্ষ নিয়ে বিপুলসংখ্যক বহিরাগত সন্ত্রাসী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে উভয়পক্ষের ৫ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুনরায় সংঘর্ষ এড়াতে ক্যাম্পাস ও আশপাশ এলাকায় বহিরাগতদের অবাধ চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ জারি করে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করলেও শেষপর্যন্ত তা জারি হয়নি।
মঙ্গলবার বিকালে শিবির ও ছাত্রদল পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির ডাক দেয়। শিবির কারমাইকেল কলেজ গেটে বিকাল ৪টায় জমায়েত ডাকে। সেখান থেকে তাদের মিছিলটি বেরোবি ক্যাম্পসে জুলাই চত্বর যাওয়ার কথা ছিল। একই সময় ছাত্রদল দুপুরে ক্যাম্পাস দখলে নিয়ে একই স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ ও রাজাকারের ছবিতে জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচির ডাক দেয়।
বেরোবি প্রধান ফটকে এই কর্মসূচিতে এসে সাংবাদিকদের যুবদলের মহানগর কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহির আলম নয়ন বলেন, আমরা দেখেছি সোমবার রাতে শিবিরের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের বহিরাগত সন্ত্রাসীরাও ছিল। আজকে তারা পুনরায় বেরোবি ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা করেছে। তাই এখানে এসেছি যদি কোনো হামলা করা হয় তা হলে রংপুর নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ড থেকে শিবিরের নাম মুছে ফেলা হবে। আমরা রাজাকারদের ছাড় দিব না।
ছাত্রদলের বেরোবির সাধারণ সম্পাদক মো. ইয়ামিন অভিযোগ করে বলেন, ছাত্রশিবিরের কর্মসূচিতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতাদের ছবি সম্বলিত একটি ব্যানার টাঙানো হয়। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সেই ব্যানার সরানোর জন্য দাবি জানালে শিবিরের পক্ষ থেকে হামলা করা হয়। এতে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আশিকুর রহমান আহত হন। তারই প্রতিবাদে তারা কর্মসূচি পালন করছেন। ওই ছাত্রদল নেতা শিবিরকে রাজাকারের সহযোগী সংগঠন বলে দাবি করেন। তারা শিবিরের কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ক্যাম্পাসে চালাতে দিবেন না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
উল্লেখ্য, গত রাতে সোমবার রাতে সংঘর্ষের পর শিবিরের সশস্ত্র হামলার মুখে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। শিবিরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বেরোবি ক্যাম্পাস। পরে মঙ্গলবার ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শক্তি বৃদ্ধি ও সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে ক্যাম্পাসে দুপুরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে নিলে শিবিরের নেতাকর্মীরা কারমাইকলে কলেজে চলে আসে। সেখানে তারা অবস্থান নিয়ে সংগঠিত হতে থাকে।
এদিকে শিবির ও ছাত্রদল কর্মসূচির ডাক দিলে নতুন করে মঙ্গলবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশ এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাস ও আশপাশ এলাকায় বহিরাগত চলাচলের উপর বিধিনিষেধ জারি করে নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়। একই সঙ্গে ভিসির পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলের আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করার জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে আবেদন জানিয়েছে।
বিকালে ছাত্রদলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর সঙ্গে যুবদলের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় বেরোবির গেটে অবস্থান নেন। সেখানে তারা বিক্ষোভ ও কয়েকজন জামায়াত নেতা রাজাকারের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে দিয়ে তাতে জুতা নিক্ষেপ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় পুলিশ কারমাইকেল কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে অবস্থান নেয়।
এদিকে বিকাল থেকে নগরীর লালবাগ এলাকায় কারমাইকেল কলেজ গেটের সামনে মহানগর শিবিরের নেতৃত্বে শিবিরের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা সন্ধ্যায় একটি মিছিল নিয়ে নগরীর শাপলা চত্বরে এসে সেখানে সমাবেশ করেন।
সেখানে বক্তব্য রাখেন- বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি রাকিব মুরাদ, রংপুর মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি আনিসুর রহমান, রংপুর মহানগর ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি সাজ্জাদ হোসেন, রংপুর জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি হামিদুর রহমান প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ছাত্রদল সারা দেশে শিবিরের নেতাকর্মীদের উপর হামলা চালাচ্ছে। তারই প্রতিবাদে আমাদের এই বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ। আমরা লক্ষ্য করছি ছাত্রদল ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের ভাষায় কথা বলছে এবং শিবিরের ওপর দমন পীড়ন চালাচ্ছে। এর পরিণতি ভালো হবে না। আমরা সব ধরনের হামলা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রস্তুত।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ ও বেরোবি প্রশাসনের মধ্যস্থতায় তারা নিজ নিজ স্থানে কর্মসূচি পালন করে। ফলে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এদিকে তাজহাট মেট্রোপলিটন থানার ওসি রফিকুল ইসলাম রফিক জানিয়েছেন সংঘর্ষের ঘটনায় এ পর্যন্ত কোনো পক্ষ অভিযোগ করেনি।
উল্লেখ্য, সোমবার ক্যাম্পাসে সন্ধ্যার পর শিবিরের আলোচিত্র প্রদর্শনীস্থলে গিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত জামায়াতের ৫ নেতা ও বিএনপির এক নেতা ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার’ উল্লেখ করা ব্যানার সরিয়ে নিতে বলে ছাত্রদল। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
এ সময় উভয়পক্ষের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ধাওয়া পাল্টাধাওয়ায় জড়িয়ে পড়ে। এতে ছাত্রশিবির-সমর্থিত বেরোবি শিক্ষার্থী পরিষদের জিএস পদপ্রার্থী মেহেদী হাসান এবং শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি সোহেল রানা ও ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আশিকুর রহমান আহত হন। অপর দুজনের নাম জানা যায়নি।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের সহিংসতাকে সমর্থন করে না। তিনি শিক্ষার্থীদের সহনশীলতা বজায় রেখে ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার আহ্বান জানান এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্যাম্পাস ও আশপাশ এলাকায় বহিরাগতদের চলাচলের ওপর বিধি নিষেধ জারি করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। এছাড়া বড় ধরনের সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়াতে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে অনুরোধপত্র দিয়েছেন তিনি। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় উভয়পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালন করায় কোনো সংঘাত হয়নি।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। এখনো ১৪৪ ধারা জারি করার মতো পরিস্থিতি হয়নি। আমরা উভয়পক্ষকে ভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালনের জন্য বলেছি। তারা সেভাবে কর্মসূচি পালন করেছেন।