নমিনির পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বেড়ে ৮০ বছর

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৯

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আকর্ষণীয় করতে কিছু পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর (নমিনি) পেনশন সুবিধা পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি মালিকানাধীন যেসব কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নেই, তাদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদ। 
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভা অনুষ্ঠিত হয়। পর্ষদ সভাপতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এতে সভাপতিত্ব করেন। সভা শেষে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য পেনশন তহবিলের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
ড. মো. সুরাতুজ্জামান আরও বলেন, সর্বজনীন পেনশনকে আকর্ষণীয় করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যারা প্রথম দিকে চাঁদা দিলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে বন্ধ করে দিয়েছেন, তাদের আবার কর্মসূচিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও কাজ চলছে।
সর্বজনীন পেনশনে চারটি স্কিম চালু রয়েছে। এগুলো হলো– প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস। এসব স্কিমের মাধ্যমে বেসরকারি চাকরিজীবী, অনিয়মিত আয়ের মানুষ এবং প্রবাসীদের পেনশন ব্যবস্থায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রায় ১০ কোটি মানুষকে আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু হয়। 
চালুর তিন বছর পার হলেও চারটি স্কিমে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছেন তিন লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন। তাদের জমা করা মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। অংশগ্রহণকারীদের মতে, ব্যাংকের আমানতের তুলনায় রিটার্ন কম এবং পেনশন পাওয়ার আগে 
গ্রাহকের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা সীমিত থাকায় এ কর্মসূচির প্রতি মানুষের আগ্রহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। এ ছাড়া অনেকে শুরুতে চাঁদা দিলেও বিভিন্ন কারণে পরে তা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন।
নমিনির সুবিধা
বর্তমানে পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর (নমিনি) ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পাওয়ার বিধান রয়েছে। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নমিনির সুবিধা আজীবন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 
সভায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর যেসব কর্মী সরকারের সরাসরি পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নেই, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসব কর্মীর অবসর-সুবিধা প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি ও নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। সরকারি সিভিল কর্মচারীদের মতো তারা রাষ্ট্রীয় পেনশন ও আনুতোষিক পান না। তবে কোন কোন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এ সুবিধা পাবেন এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, তার পূর্ণ তালিকা ও পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবেচনায় নিয়ে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সর্বজনীন পেনশন তহবিলে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পরিচালনা পর্ষদ। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হয়েছিল। 
চালু হবে ইসলামিক পেনশন
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে ইসলামিক বা শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে পর্ষদ। এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ স্থানীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ইসলামিক পেনশন ব্যবস্থার জন্য আলাদা বিধিমালা করা হবে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান।
এদিকে বিদ্যমান ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন দেওয়ার একটি প্রস্তাবও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে অ্যাকচুয়ারিয়াল পরামর্শ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অন্যান্য দেশের অবসর ও পেনশন ব্যবস্থাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, স্পেনে ৬৭ বছর এবং যুক্তরাজ্যে ৬৬ বছর বয়স থেকে পেনশন সুবিধা দেওয়া হয়। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। ফলে ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন দেওয়ার প্রস্তাবটি আর্থিক ও জনমিতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।

অন্যান্য বিষয়
পেনশন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির পাঁচ বছর পর অংশগ্রহণকারী তাঁর জমা করা পুরো অর্থ তুলে নিয়ে কর্মসূচি থেকে বের হয়ে যেতে পারবেন– এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রস্তাবটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, সাধারণভাবে টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে শারীরিক অক্ষমতার কারণে কেউ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে বীমার আওতায় তাঁর অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
সর্বজনীন পেনশন তহবিল থেকে অংশগ্রহণকারীদের ঋণ দেওয়ার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ঋণ দেওয়া হলে তহবিলের কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন নিশ্চিত করা এবং অংশগ্রহণকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তা বিবেচনায় নিয়ে অ্যাকচুয়ারিয়াল নির্দেশনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পেনশন কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্য বীমা চালুর বিষয়টিও পর্যালোচনা করা হবে। কোন মডেলে স্বাস্থ্য বীমা চালু করা হবে এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক প্রভাব বা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে পেনশনের মুনাফা দেওয়ার প্রস্তাব থাকলেও বিষয়টিতে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। পেনশন তহবিলের আকার আরও বড় হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রবাসীদের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশ যাওয়ার সময়ই তাদের এ কর্মসূচি সম্পর্কে জানানো হবে। এ জন্য প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কাজ করবে বলে জানান ড. সুরাতুজ্জামান।
গ্রাহক নিবন্ধন বাড়াতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে প্রদেয় কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবও সভায় আলোচিত হয়। বর্তমানে প্রদেয় কমিশন ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক, ডাক বিভাগ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কমিশন নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।