নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়ায় হল অনুষ্ঠিত উএসবিসিসিআই রিয়েল এস্টেট এক্সপো 

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২১ মে ২০২৬, ১৫:১৫

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটির ব্যবসায়িক ও বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করতে অনুষ্ঠিত হলো তৃতীয় ইউএসবিসিসিআই রিয়েল এস্টেট এক্সপো ২০২৬। রিয়েল এস্টেট, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আর্থিক পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত ১৬ মে দিনব্যাপী এক্সপো শুধু একটি প্রদর্শনী নয়, বরং ছিল জ্ঞান বিনিময়, নেটওয়ার্কিং এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা। নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিয়ট হোটেলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে অংশ নেন রিয়েল এস্টেট খাতের পেশাজীবী, বিনিয়োগকারী, মর্টগেজ বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, আইনজীবী এবং বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য গৃহক্রেতা।
ইউএস বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ইউএসবিসিসিআই) আয়োজিত এ বছরের এক্সপোতে রিয়েল এস্টেট, মর্টগেজ, ফাইন্যান্স, আইন, ব্যাংকিং, বিমা, বিনিয়োগ, ট্যাক্স ও প্রযুক্তি খাতের শতাধিক পেশাজীবী অংশ নেন। আয়োজকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটির মধ্যে বাড়ি কেনা, রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ, আর্থিক পরিকল্পনা ও ব্যবসায়িক সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ আয়োজন করা হয়েছে।
এক্সপোতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য ছিল তথ্যবহুল সেশন, প্যানেল আলোচনা, নেটওয়ার্কিং সুযোগ, বিনিয়োগ বিষয়ক পরামর্শ এবং রিয়েল এস্টেট বাজারের সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে বিশদ উপস্থাপনা। বিশেষ করে, যারা প্রথমবার বাড়ি কিনতে আগ্রহী, তাদের জন্য মর্টগেজ, ক্রেডিট স্কোর, ডাউন পেমেন্ট, প্রি-অ্যাপ্রুভাল এবং ফাইন্যান্সিং সংক্রান্ত বিশেষ দিকনির্দেশনা ছিল অন্যতম আকর্ষণ।
ইউএসবিসিসিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ও সিইও মো. লিটন আহমেদ অংশগ্রহণকারীদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো রিয়েল এস্টেট খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন এবং কমিউনিটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
তিনি বলেন, ‘আজকের এই এক্সপো প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশি-আমেরিকান কমিউনিটি রিয়েল এস্টেট, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ক্রমেই আরও সচেতন ও আগ্রহী হয়ে উঠছে। ইউএসবিসিসিআই সব সময় কমিউনিটির অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।’তিনি আরও বলেন, এই এক্সপো শুধু একটি ব্যবসায়িক আয়োজন নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ গঠন, বিনিয়োগ জ্ঞান বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরির একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের আয়োজন করা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও সিইও মার্ক জ্যাফে, টার্কিশ আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ইউএসএর প্রেসিডেন্ট আলী কোচাক, লং আইল্যান্ড বোর্ড অব রিয়েলটরসের প্রেসিডেন্ট শান খানসহ ব্যবসা ও রিয়েল এস্টেট খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া কমিউনিটি নেতা, বিনিয়োগকারী, রিয়েলটর, ব্যাংকার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এক্সপোতে বর্তমান রিয়েল এস্টেট মার্কেট নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। ‘এআই অ্যাডভান্টেজ : টেক টুলস দ্যাট ক্লোজ ডিলস ফাস্টার’ শীর্ষক সেশনে রিয়েল এস্টেট খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মার্কেটিং, স্মার্ট লিড জেনারেশন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, বর্তমান বাজারে প্রযুক্তি ও এআই-ভিত্তিক সেবা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবসায়িক সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
‘মার্কেট পালস ২০২৬ : রেটস, ডিলস অ্যান্ড হোয়াটস নেক্সট’ সেশনে সুদের হার, বাড়ির চাহিদা, বিনিয়োগের সুযোগ, বাজারের পরিবর্তন এবং আগামী দিনের রিয়েল এস্টেট প্রবণতা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই এ সেশন থেকে বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করেন। ‘ফেইথ অ্যান্ড ফাইন্যান্স : হালাল হোম লোনস অ্যান্ড লিগ্যাসি প্ল্যানিং’ সেশনে শরিয়াহসম্মত হোম ফাইন্যান্সিং, পরিবারভিত্তিক সম্পদ পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। মুসলিম কমিউনিটির অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এ সেশন ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।
প্রথমবার বাড়ি ক্রেতাদের জন্য আয়োজিত ‘কিজ টু ইয়োর ফার্স্ট হোম : ইনসাইডার গাইড ফর নিউ বায়ার্স’ সেশনে ক্রেডিট স্কোর উন্নয়ন, ডাউন পেমেন্ট, মর্টগেজ অনুমোদন, ফার্স্ট-টাইম হোমবায়ার প্রোগ্রাম এবং বাড়ি কেনার ধাপসমূহ নিয়ে বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
বক্তারা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং ব্যক্তিগত পরামর্শ প্রদান করেন।এ ছাড়া ‘আনলকিং ইনভেন্টরি ইন টুডেজ মার্কেট’ এবং ‘ফিক্স অ্যান্ড ফ্লিপ, লিগ্যালাইজিং বেসমেন্টস, নিউ বিল্ড অ্যান্ড ট্যাক্স স্ট্র্যাটেজিস’ শীর্ষক সেশনগুলোতে বর্তমান মার্কেটে বাড়ির সংকট, সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ এলাকা, নতুন নির্মাণ, বেসমেন্ট বৈধকরণ, ফিক্স-অ্যান্ড-ফ্লিপ প্রজেক্ট, ট্যাক্স সেভিংস এবং সম্পদ গঠনের কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শাহেদ ইসলাম, মোহাম্মদ জামান, তারিক খান, আমব্রিন ফারুকী, মাইকেল লাগুডিস, মাইকেল ফং, কেভিন লেদারম্যান, আজাদুল ইসলাম, ওসমান মালিক, সামি কবির, আদিল সাদিক, আমিনা রাশাদ, ফাহিম হোসেন, পিটার কারলিন, মোহাম্মদ রহমান শাহীন, সরদার এম. আসাদুল্লাহ, শান খান, আইস্টন পেরেজ, এমরান ভূঁইয়া, ইসমাইল আহমেদ, আহাদ আলী সিপিএ, দিলারা হোসেন, মাইকেল ন্যাকমিয়াস, তারিক বেইলি এবং মোহাম্মদ মজুমদার। বক্তারা তাদের অভিজ্ঞতা, বিশ্লেষণ ও বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে বাড়ি ক্রেতা, বিনিয়োগকারী, রিয়েলটর, মর্টগেজ পেশাজীবী ও কমিউনিটি সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করেন।
এক্সপোটি অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি কার্যকর নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দর্শনার্থীরা সরাসরি রিয়েল এস্টেট এজেন্ট, মর্টগেজ ব্রোকার, অ্যাটর্নি, সিপিএ, ব্যাংক প্রতিনিধি, বিমা বিশেষজ্ঞ, ডেভেলপার এবং ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ পান। একই ছাদের নিচে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি অংশগ্রহণকারীদের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করে তোলে।
আয়োজকদের তথ্যমতে, এবারের এক্সপোতে ছয়টির বেশি এক্সপার্ট প্যানেল, ৬০টির বেশি এক্সিবিটর এবং দেড় হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন। ছিল অন-দ্য-স্পট প্রি-অ্যাপ্রুভাল সুবিধা এবং প্রথমবারের হোমবায়ারদের জন্য বিশেষ সহায়তা। অনেক অংশগ্রহণকারী তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও আবেদন করার সুযোগ পান।
দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল ফ্রি ব্রেকফাস্ট, ফ্রি প্রফেশনাল হেডশট, ফ্রি পার্কিং, কমপ্লিমেন্টারি পিৎজা লাঞ্চ এবং প্রাণবন্ত লাইভ নেটওয়ার্কিং সেশন। এসব আয়োজন পুরো এক্সপোকে আরও প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলে।
এক্সপোতে ইউএসবিসিসিআইয়ের সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। একটি গ্রেটার নিউইয়র্ক চেম্বার অব কমার্স এবং অন্যটি টার্কিশ আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ইউএসএর সঙ্গে। স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেন মো. লিটন আহমেদ, মার্ক জ্যাফে এবং আলী কোচাক। আয়োজকদের আশা, এসব সমঝোতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সহযোগিতা, বিনিয়োগ সুযোগ এবং বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক আরও সম্প্রসারিত হবে।
এক্সপোর প্লাটিনাম স্পন্সর ছিল গাইডেন্স রেসিডেনশিয়াল, ইউনাইটেড পাবলিক অ্যাডজাস্টার্স অ্যান্ড অ্যাপ্রেইজার্স ইনক এবং সারদারিয়ান এম. অফিস অব পি.সি. এলএলসি। গোল্ড স্পন্সর ছিল মর্টগেজ ডিপো, লিবর এবং আমানা লিগ্যাল পি.সি। সিলভার স্পন্সর ছিল সিটিওয়াইড ইন্স্যুরেন্স এজেন্সি, মেডোব্রুক ফাইন্যান্সিয়াল মর্টগেজ ব্যাংকার্স করপোরেশন ও চেজ। করপোরেট স্পন্সর ছিল নাকমিয়াস ল’ ফার্ম, হক-আই ইন্সপেকশনস, এসজে ইনোভেশন এআই ফার্স্ট সলিউশনস এবং সিএমজি হোম লোনস।
অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল এমঅ্যান্ডটি ব্যাংক, নিউইয়র্ক লাইফ, কন এডিসন, এনওয়াইসি বিল্ডিংস, নিউইয়র্ক ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক সার্ভিস, এইচএবি ব্যাংক, এক্সিট রিয়েলটি ডিকে, গ্লোবাল এলিট রিয়েলটি এলএলসি, রিম্যাক্স হেরিটেজ, আইআরএস, ইউএনএমবি হোম লোনস ইনক, কুইন্স চেম্বার অব কমার্সসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।মিডিয়া পার্টনার ছিল ডেইলি নিউজ মিডিয়া গ্রুপ এবং টেক পার্টনার ছিল ইউএসবিডি ডিজিটাল সলিউশনস।
আয়োজনে সহযোগিতা করে লিবর ও কুইন্স চেম্বার অব কমার্স।আয়োজকদের মতে, ইউএসবিসিসিআই রিয়েল এস্টেট এক্সপো ইতোমধ্যে নিউইয়র্কের ব্যবসায়িক ও রিয়েল এস্টেট কমিউনিটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এবারের সফল আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের উদ্যোগ আয়োজনের পথ সুগম করবে বলেও তারা আশা প্রকাশ করেন।