চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মব’ তৈরি

সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে শিক্ষক হেনস্তাকারীরা ছাত্রশিবির-সম্পৃক্ত

ডেস্করিপোর্ট
  ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:২২
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদকে টেনে–হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছেন চাকসুর দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন

‘আপনি নিজ যোগ্যতায় বসেননি, আপনাকে আমরা বসিয়েছি, আপনি আমাদের কথা শুনতে বাধ্য।’ ২০২৫ সালের ৪ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে তাঁর কক্ষে বসে এভাবেই শাসানো হয়। গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর আরও কয়েকজন শিক্ষক হেনস্তার শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ এক শিক্ষককে ধাওয়া করে ধরে নিয়ে প্রক্টর অফিসে সোপর্দ করেছেন চাকসু প্রতিনিধিরা। একের পর এক এসব ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে শিক্ষকদের মাঝে। 
‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ ব্যানারে যারা এসব ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাদের অনেকে ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে জড়িত। আবার কেউ কেউ ছাত্রশিবির নিয়ন্ত্রিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন আগে থেকেই। 
বিশিষ্টজন বলছেন, কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে। কিন্তু ‘মব’ তৈরির মাধ্যমে হেনস্তা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। পুরো সমাজ ব্যবস্থায় খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় অন্য দশটি সাধারণ প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। এখানে যারা জ্ঞান বিতরণ করেন কিংবা জ্ঞান গ্রহণ করেন, তারা সবাই জাতির মেধাবী সন্তান। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ভিন্ন চিত্র দেখছি আমরা চবিতে। উপাচার্যকে তাঁর কক্ষে বসে শাসাচ্ছে তাঁরই ছাত্র। শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে রাখছে যারা, তারাও তাঁর ছাত্র। সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে যারা এসব অপকর্ম করছে, তারা আবার রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাচ্ছে। তাই হেনস্তা হওয়ার পরও ভুক্তভোগী শিক্ষক কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। অভিযোগ দিতে ভয় পাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। উপাচার্য নিজেও নেননি। এটি পুরো সমাজ ব্যবস্থায় একটা খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।’ 
তবে চাকসুর ভিপি ও চবি শাখা শিবিরের সভাপতি ইব্রাহিম রনি বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তারা অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন নষ্ট করেছেন। এখনও নিষিদ্ধ ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে। ক্ষুব্ধ হয়ে তাই শিক্ষার্থীরাই তাদের প্রতিরোধ করছে। তারা তাদের অপকর্মের শাস্তি ভোগ করেছে।’ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের আগে কাউকে দোষী সাব্যস্থ করা যায় কিনা– এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটির কাজ তদন্ত কমিটি করবে। শিক্ষার্থীদের কাজ শিক্ষার্থীরা করছে।’
সাধারণ শিক্ষার্থীর আড়ালে ভিন্ন পরিচয়
চবিতে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক রন্টু দাশকে প্রথমে হেনস্তা করা হয় সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে। তোপের মুখে তখন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। এরপর ২০২৫ সালের ৪ জুলাই সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তীকে প্রশাসনিক ভবনে তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। হেনস্তার এই ঘটনায়ও নেতৃত্বে ছিলেন ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’রা। একই দিন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতারের কক্ষে বসে তাঁকেই হেনস্তা করে শিক্ষার্থীরা। জানা গেছে, উপাচার্য ও কুশল বরণের ঘটনার সময় উপাচার্য দপ্তরে উপস্থিত ছিলেন চবি শাখা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ পারভেজ, প্রচার সম্পাদক ও চাকসুর যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক ইসহাক ভূঁইয়া, সাবেক অফিস কার্যক্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুল্লাহ খালেদ, সাবেক কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক সাখাওয়াত শিপন এবং তাহসান হাবিব, মশিউর রহমান সোহাগ ও আব্দুর রহিম। শিক্ষক রন্টু দাশকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন চবি শাখা শিবিরের ইসহাক ভূঁইয়া, পারভেজ ও হাবিবুল্লাহ খালেদ। 
সর্বশেষ ঘটনায় ছিলেন যারা
সর্বশেষ গত ১০ জানুয়ারি আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে হেনস্তার ঘটনায় নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল্লাহ আল নোমান, মাছুম বিল্লাহ, মেহেদী হাসান সোহান, ফজলে রাব্বি তৌহিদ। তারা দিনে সক্রিয় থাকলেও রাতে তৎপর ছিলেন জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা। তারা সবাই এবারের চাকসুতে শিবির সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। আবদুল্লাহ আল নোমান চাকসুর দপ্তর সম্পাদক, মাসুম বিল্লাহ পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া-বিষয়ক সম্পাদক, মেহেদী হাসান সোহান ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক, ফজলে রাব্বি তওহীদ আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক। ওবায়দুল সালমান আছেন সহযোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক পদে, জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা সহছাত্রী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক। সোহানুর রহমান নির্বাহী সদস্য। 
যা বললেন ভুক্তভোগী শিক্ষক রোমান
শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি এক দিনের জন্যও বের হইনি। কোনো দায়িত্বেও ছিলাম না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষকদের মৌন মিছিল হয়েছিল, সেখানেও অংশ নেইনি। শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করে, এমন কোনো বোর্ডের সদস্যও ছিলাম না। সহকারী প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি কারও বিরুদ্ধে মামলা দেইনি।’
এ প্রসঙ্গে প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর কোনো শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করতে পারেন না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে সে বিষয় হেলথ অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির কাছে যায়। সেখানে কোনো সহকারী প্রক্টর থাকতে পারেন না। কোনো কমিটি গঠন করা হলে শুধু প্রক্টর সেখানে দায়িত্বশীল হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারেন।’ সহকারী প্রক্টর কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা দিতে পারেন কিনা– এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রক্টর বা সহকারী প্রক্টর সরাসরি মামলার বাদী হতে পারেন না। আগেও এমন ঘটনায় আমরা নিরাপত্তাপ্রধান বা কাউকে খুঁজেছি মামলার বাদী হওয়ার জন্য।’

শিক্ষক হেনস্তার কোনো অভিযোগই পায়নি প্রশাসন 
মব তৈরি করে একের পর এক শিক্ষক হেনস্তার ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত দায়ী কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তি ও সোহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য যা যা প্রয়োজন ছিল আমরা তা করেছি। শিক্ষক হেনস্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাইনি। পেলে আমরা সেটি নিয়ে কাজ করব। এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ আসেনি।’ 
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মো. কামাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুজন শিক্ষকের কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তাদের রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে একজনের বেতন-ভাতা বন্ধ আছে। আরেকজনের বিষয়ে তদন্ত চলমান আছে। তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষক হেনস্তার কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। কোনো শিক্ষক এরকম অভিযোগ করেননি।’
আতঙ্কে শিক্ষকরা
সরকার পতনের পর শিক্ষক হেনস্তার কোনো ঘটনায়ই দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় উদ্বিগ্ন শিক্ষকরা।  তারা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ভয়ে নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আইন বিভাগের শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমান জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে সরব ছিলেন কিনা– সেটা জানতে আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক রকিবা নবীর মোবাইল ফোনে পরিচয় দিয়ে খুদে বার্তা পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি। 
তবে জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খ. আলী আর রাজী বিষয়টিকে ‘অপহরণের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি ফেসবুকে লিখেছেন ‘সম্মতি ছাড়া কাউকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার অধিকার কারও নেই। শিক্ষক হাসান মোহাম্মদ রোমানের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার তীব্র নিন্দা জানাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা দাবি করছি।’
শিক্ষককে ধরে প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়ার ব্যাখ্যা দিল চাকসু
আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানকে ধাওয়া দিয়ে ধরে প্রক্টর কার্যালয়ে নেওয়ার ঘটনায় ব্যাখ্যা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)। গতকাল চাকসু ভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থান ও আওয়ামিপন্থি রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক হাসান মোহাম্মদকে পুনর্বাসনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বারবার জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও কোনো সহযোগিতা পায়নি চাকসু। প্রশাসনের এই রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা ও অসহযোগিতার কারণেই চাকসু নেতারা অভিযুক্তকে ধরে প্রক্টর কার্যালয়ে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে চাকসু ভিপি মো. ইব্রাহীম, মুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক মোনায়েম শরীফ, আইন ও মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ফজলে রাব্বি, সহযোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুল সালমান, ছাত্রী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক নহিমা আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘চাকসু যদি অসহযোগিতার অভিযোগ তোলে, তাহলে তারা যেন সুস্পষ্টভাবে লিখিত দেয়। যারা জুলাই আন্দোলনে বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের বিষয়ে তদন্ত একবার হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে তদন্ত চলমান। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হয়।’
সূত্র: সমকাল