
মোহাম্মদ নাজির পাকতিয়াওয়াল জন্মসূত্রে আফগান নাগরিক। শৈশব-কৈশরও কেটেছে এশিয়ার দেশটিতে। তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন চলার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও অংশ নেন। দীর্ঘদিন মার্কিন সেনা ও ন্যাটো সৈন্যদের সঙ্গে মিলে নিজ দেশের বিরুদ্ধে লড়েছেন নাজির। কিন্তু দুই দশকের লড়াইয়ে পশ্চিমা সেনারা পালিয়ে গেলে তালেবান আবার রাষ্ট্রক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে।
২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিলে নাজিরও যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেই থেকে তিনি সেখানেই বসবাস করছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে নিজ দেশের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য পুরস্কৃত হওয়াতো দূরের কথা, অবশেষে তার করুণ পরিণতি হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর হাতেই মৃত্যু হয়েছে বলে নাজিরের পরিবার ও বন্ধুরা দাবি করেছে।
মার্কিন ইমিগ্রেশন হেফাজতে আফগান নাগরিকের মৃত্যু; ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘আমেরিকান বীরকে’ হত্যার অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
মার্কিন ইমিগ্রেশন হেফাজতে মারা যাওয়া এ আফগান নাগরিকের পরিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ‘আমেরিকান জনগণের এক বীরকে’ হত্যার অভিযোগ তুলেছে।
নাজিরের বয়স চলছিল ৪১ বছর। তাকে গত শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টরা টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়। এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা পরেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
নাজিরের বন্ধু ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তার ‘জন্মের পর থেকে প্রিয় বন্ধুকে’ হত্যার অভিযোগ তুলেছেন।
নাজির রিচার্ডসন শহরে বসবাস করতেন এবং তার অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনটি বিবেচনাধীন থাকা অবস্থায় তিনি সেখানে রুটি তৈরির কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। গত শুক্রবার সকালে তিনি যখন তার সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
আইসিই জানায়, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি 'স্ন্যাপ'-এর ফুড স্ট্যাম্প অপব্যবহার করে জালিয়াতির অভিযোগে নাজিরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
ডালাস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অফিসের এক মুখপাত্র বলেছেন, নাজিরের বিরুদ্ধে ২০০ ডলার বা তার বেশি মূল্যের স্ন্যাপ জালিয়াতির দুটি মামলা (যা থার্ড-ডিগ্রি ফেলনি বা গুরুতর অপরাধ) এবং একটি চুরির মামলা নথিভুক্ত ছিল। তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মামলাগুলোর শুনানি আদালতে শুরু হয়নি।
ছয় সন্তানের এই জনকের—যাদের মধ্যে কনিষ্ঠজনের বয়স মাত্র ১৮ মাস—শনিবার সকাল ৯টায় ডালাসের পার্কল্যান্ড হাসপাতালে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। তবে পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো অজানা।
নাজিরের পরিবার এখন এটি জানার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে যে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার হেফাজতে ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
তার ভাই কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘সে শুধু আমার ভাই ছিল না; সে ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। সে এমন একজন মানুষ ছিল যার সঙ্গে আমি সব শেয়ার করতে পারতাম। আমি সবসময় তার ওপর ভরসা করতাম। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমি তার কাছেই যেতাম।’
‘এখন তার বিনা আমি নিঃস্ব, স্রেফ নিঃস্ব। সে আমার জন্য সবকিছু ছিল। সে তার পরিবারের জন্য, আমার মায়ের জন্য, আমাদের পুরো পরিবারের জন্য সবকিছু ছিল,’ তিনি বলতে থাকেন।
তারা আমার কাছ থেকে, তার পরিবারের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে ওই ছয়টি সন্তান আর তার স্ত্রীর কাছ থেকে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বিবৃতিতে নাজিরকে একজন ‘অপরাধী অবৈধ এলিয়েন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যিনি ২০২১ সালের আগস্টে বাইডেন প্রশাসনের ‘অপারেশন অ্যালিস রিফিউজ’-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন।
তারা দাবি করেছে, তিনি তার সামরিক চাকরির কোনো রেকর্ড প্রদান করেননি। আমাদের দেশে তার অপরাধমূলক ইতিহাসের মধ্যে রয়েছে ফুড স্ট্যাম্পের জালিয়াতি এবং চুরির জন্য গ্রেপ্তার। গত ২০ আগস্ট নাজিরের প্যারোলের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
তবে তার পরিবার জানায়, নাজির একজন আফগান স্পেশাল ফোর্সের সদস্য ছিলেন এবং আফগানিস্তানের অন্যতম বিপজ্জনক স্থান পূর্ব পাকতিকা প্রদেশে মার্কিন সেনাবাহিনীর থার্ড স্পেশাল ফোর্সেস গ্রুপের সঙ্গে প্রায় এক দশক কাজ করেছেন।
পরিবার আরও জানায়, তিনি ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিক সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন এবং স্থল সীমান্ত অতিক্রম করে নয়। ক্যাথলিক চ্যারিটির মাধ্যমে তাকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল।
নাজির আগে কাবুলে থাকতেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন এবং এর সাক্ষাৎকারও সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি কাজের অনুমতি এবং সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরও পেয়েছিলেন। এমনকি তার এক সন্তান জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক।
নাসির বলেন, ‘আমার ভাই কোনো অবৈধ অপরাধী এলিয়েন ছিল না, তারা যাই বলুক না কেন। আমরা আমেরিকানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছি, বিশেষ করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং ন্যাটো বাহিনীর সঙ্গে।’
তিনি আরও বলেন, সে এখানে বৈধভাবেই ছিল এবং সে ছিল একজন বীর, একজন যুদ্ধাহত সৈনিক। সে তার দেশের জন্য এবং নিজের মানুষের জন্য বীর ছিল। সে আমেরিকান জনগণ এবং এই সমাজের জন্যও একজন বীর ছিল। সে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সেবা করেছে, আর বিনিময়ে তাকে এই মৃত্যু উপহার দেওয়া হলো।
নাজিরের অসুস্থতা ও মৃত্যু নিয়ে আইসিই ও পরিবারের বক্তব্য
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মুখপাত্র লরেন বিস জানান, গ্রেপ্তারের পর ডালাসের একটি আইসিই ফিল্ড অফিসে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় নাজির শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথার কথা জানিয়েছিলেন। তাকে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলে তিনি আতঙ্কিত অবস্থায় তার ভাইকে ফোন করেন। তার ভাই জানান, ফোনে নাজিরকে অত্যন্ত ভীত ও আতঙ্কিত শোনাচ্ছিল।
নিহত নাজিরের ভাই জানান, ‘সে বলেছিল—তারা আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে গাড়িতে তুলে নিয়েছে, এমনকি আমাকে কিছু বলার সুযোগও দেয়নি।’ সে সময় নাজির জানতেন না তাকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাই বলেছিল তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং শরীরে ফোলাভাব ও ব্যথার কথা জানিয়েছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম সে ভয় পেয়েছে; সে বারবার বলছিল সে জানে না কেন তাকে সেখানে আনা হয়েছে বা কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে।’
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি জানায়, শনিবার পাকতিয়াওয়ালকে পার্কল্যান্ড হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তার জিব ফুলে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। সিপিআর দেওয়া সত্ত্বেও তিনি মারা যান। তবে তার পরিবার অভিযোগ করেছে, এটি দুর্ব্যবহারের প্রমাণ। তাদের দাবি, নাজিরকে তার জরুরি ‘এসওএস ইনহেলার’ ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি।
উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান ও প্রতিক্রিয়া
চলতি অর্থবছর (যা অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে) আইসিই হেফাজতে এটি অন্তত ২৪তম মৃত্যুর ঘটনা। দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই বছর বন্দি মৃত্যুর দিক থেকে সব থেকে ভয়াবহ হতে যাচ্ছে।
ন্যাটো বাহিনীর আফগান সহযোগী ও শরণার্থীদের সহায়তা দানকারী গ্রুপ ‘আফগান ইভাক’ নাজিরের এই মৃত্যুকে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ বলে বর্ণনা করেছে।
সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট শন ভ্যানডাইভার বলেন, ‘নাজির আফগানিস্তানের যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন এবং এখানে নতুন করে জীবন গড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করেছিলেন।’
তিনি আরও যোগ করেন, সরকারের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত যে, ছয় সন্তানের একজন ৪১ বছর বয়সী জনক আইসিই হেফাজতে যাওয়ার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কীভাবে মারা গেলেন। কোনো সাজা ছাড়াই যুদ্ধে সাহায্যকারী একজন ব্যক্তিকে ‘অপরাধী’ বলা এবং আন্তঃসংস্থা সিস্টেম পরীক্ষা না করেই তার কাজের ‘কোনো রেকর্ড নেই’ বলে দাবি করাটা কোনো তদন্ত নয়, বরং এটি বড় কোনো ভুল ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।
নাজিরের পরিবার এখন তার মরদেহ নিয়ে আফগানিস্তানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে নিজ জন্মভূমিতেই তাকে সমাহিত করা যায়।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।