
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা এখন পর্যন্ত তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রায় প্রতিদিনের হামলায় দেশটির সামরিক কমান্ড কাঠামোর ওপরের প্রায় সব স্তর নির্মূল হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও ইরান পিছু না হটে উল্টো যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তেহরানের লক্ষ্য, এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ নিজেদের অনুকূলে পুনর্গঠন করা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এ খবর জানিয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা আর অব্যবস্থাপনায় পিষ্ট ইরানি জনগণ এখন যুদ্ধের কারণে নিত্যপণ্যের অভাব এবং অবকাঠামোগত ধ্বংসের মুখে। কিন্তু এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও টিকে থাকা ইরানি নেতারা সুর নরম করছেন না। তারা দাবি করছেন, ইরান যেকোনও কষ্ট সইতে সক্ষম এবং তাদের লক্ষ্য হলো যুদ্ধকে টেনে লম্বা করা, যাতে আঞ্চলিক ও বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা জিইয়ে রাখা যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ‘সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ দাবি করলেও তেহরান উল্টো নিজেদের ‘বিজয়ী’ হিসেবে দাবি করছে এবং শান্তির জন্য চড়া মূল্য নির্ধারণ করেছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান আঞ্চলিক স্থিতাবস্থার পরিবর্তন, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের পুরনো সামরিক জোটে পরিবর্তন চাইছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার বলেন, “যুদ্ধবিরতি কেবল তখনই যৌক্তিক হবে যখন গ্যারান্টি দেওয়া হবে যে যুদ্ধ আর শুরু হবে না। শত্রুকে তাদের ধ্বংস হওয়া রাডার মেরামত বা ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণের সুযোগ দিয়ে আবার আমাদের ওপর হামলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কোনও যুদ্ধবিরতি হবে না।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার জানিয়েছেন, যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালির জন্য একটি ‘নতুন প্রোটোকল’ থাকতে হবে যেখানে ইরানের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমনকি বিদেশে তাদের জব্দ করা অর্থ ফেরত পাওয়া বা আন্তর্জাতিক জলসীমার এই সংকীর্ণ পথ ব্যবহারের জন্য ট্রানজিট ফি আদায়ের দাবিও তুলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরান যুদ্ধে হারছে। ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরানের সামরিক বাহিনী ‘বিধ্বস্ত’ এবং তাদের সব পর্যায়ের নেতারা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এই বার্তার কয়েক ঘণ্টা পরেই ইরান ইসরায়েলে তাদের ৬১তম দফার হামলা চালায়।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নার্গিস বাজঘলি বলেন, প্রথাগত সামরিক সংজ্ঞায় ইরান হয়তো জিতছে না, কিন্তু তাদের সেভাবে জেতার প্রয়োজনও নেই। তাদের পুরো কৌশলটি ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ ভিত্তিক, যেখানে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচকে অসহনীয় করে তুলবে।
তিনি মনে করেন, জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং আকাশচুম্বী দাম যুক্তরাষ্ট্র বা উপসাগরীয় দেশগুলো অনির্দিষ্টকাল সহ্য করতে পারবে না। ইরান ঠিক এই জায়গাটিতেই চাপ দিচ্ছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) আগে থেকেই একটি বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামোর পরিকল্পনা করে রেখেছিল। গালিবাফ বলেন, “আমরা জানতাম আমাদের ওপর হামলা হবে, তাই দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম।”
নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে ইরান এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা বা অর্থনীতির তোয়াক্কা করছে না। আইআরজিসি ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং সৌদি আরবের হোটেল, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং জ্বালানি স্থাপনায় নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে সৌদি আরব হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, প্রয়োজন হলে তারাও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেবে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো সিনা টুসি বলেন, ইরান এখন একটি নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য চাইছে যেখানে তাদের স্থিতিশীলতাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার সঙ্গে গেঁথে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, ইরান অস্থিতিশীল থাকলে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থিতিশীল থাকবে, তেহরান এই বার্তাটিই দিচ্ছে।
ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আমির আকরামিনিয়া বুধবার দাবি করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে গত পাঁচ দশকের মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার আজ ‘পতন ঘটেছে’। তবে ইরানের এই কৌশল কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ স্পষ্ট করেছেন যে, যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলো বরং ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
আমিরাতের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী রিম আল-হাশেমি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কৌশলগত অংশীদারত্ব কয়েক দশকের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ইরানের হুমকিতে নড়বড়ে হবে না।
শেষ পর্যন্ত ইরানের বর্তমান লক্ষ্য সামরিক বিজয় নয়, বরং টিকে থাকা এবং এমন একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি বজায় রাখা যাতে যুদ্ধ-পরবর্তী শর্তগুলো তাদের ইচ্ছানুযায়ী নির্ধারিত হয়। সিনা টুসির মতে, ইরানের চূড়ান্ত লক্ষ্য লড়াই জিতে যাওয়া নয়, বরং এটা নিশ্চিত করা যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা সবার জন্যই অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়।