
যুদ্ধ বন্ধে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার (২৩ মার্চ) ঘোষণা দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বৈঠক বা সংলাপের কথা অস্বীকার করা হয়েছে। তবে লোকচক্ষুর অন্তরালে এই সংঘাত বন্ধে নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে তুরস্ক, রাশিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: কোথায় হতে পারে শান্তি আলোচনা বা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সম্ভাব্য বৈঠক।
কাঙ্খিত ও প্রত্যাশিত সেই ভেন্যু নিয়েও রয়েছে নানা গুঞ্জন। গত ফেব্রুয়ারিতে উপসাগরীয় দেশ ওমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলমান থাকাবস্থায়ই ইরানে আগ্রাসন শুরু করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে মাস্কাটকে আর সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করছে না কোনো পক্ষ।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের মধ্যকার যুদ্ধে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া পাকিস্তান এখন ইরান এবং তার শত্রু রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তি স্থাপনে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছে।
ইসলামাবাদ এই কাজে তাদের সেনাপ্রধানের সঙ্গে তেহরানের সুসম্পর্ক এবং ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগাচ্ছে।
এখন পর্যন্ত ইসলামাবাদ ইরানে হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে অত্যন্ত সতর্ক কূটনীতি অনুসরণ করছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে ইসলামাবাদের নাম প্রস্তাব করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির রোববার (২২ মার্চ) মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফ সোমবার (২৩ মার্চ) ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। শরিফ ও পেজেশকিয়ানের এই ফোনালাপটি ঠিক তখনই হলো যখন ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘ধ্বংস’ করার হুমকি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন যে, যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে তেহরানের সঙ্গে ‘অত্যন্ত ভালো এবং ফলপ্রসূ’ আলোচনার পর তিনি তার হুমকি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও ইরান এই আলোচনার দাবি অস্বীকার করেছে, তবে তারা স্বীকার করেছে যে কিছু আঞ্চলিক দেশ মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় জড়িত রয়েছে।
‘গত কয়েক দিনে কিছু বন্ধুরাষ্ট্রের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ সম্বলিত বার্তা পাওয়া গেছে। আমাদের দেশের মৌলিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে [সেই উদ্যোগগুলোর] যথাযথ উত্তর দেওয়া হয়েছে,’ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনাকে এ কথা জানান।
মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেন যে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি বা যুদ্ধ শেষ করার শর্তের বিষয়ে ইরানের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এম.বি. গালিবাফও বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে চোরাবালিতে আটকে আছে তা থেকে বাঁচতে 'ফেক নিউজ' ব্যবহার করা হচ্ছে।’
পাকিস্তানের প্রচেষ্টা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তেহরান এবং ট্রাম্পের দূত উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মধ্যে নেপথ্যে আলোচনার সুযোগ করে দিচ্ছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। সোমবার (২৩ মার্চ) তাদের কথোপকথনের সারসংক্ষেপে পাকিস্তান জানায়, ইরানি প্রেসিডেন্টের কাছে পাকিস্তানের নেতৃত্বের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, শান্তি স্থাপনে পাকিস্তান গঠনমূলক ভূমিকা পালন অব্যাহত রাখবে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গত সপ্তাহে রিয়াদে এক বৈঠকে আরব সমকক্ষদের জানিয়েছেন যে ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে, তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। একজন কূটনীতিক বলেছেন যে, পাকিস্তান মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।
পাকিস্তানে কোনো মার্কিন ঘাঁটি নেই এবং এটি এই অঞ্চলের সেই অল্পসংখ্যক মার্কিন মিত্রদের একটি যারা তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রেহাই পেয়েছে। বিষয়টি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি নিরপেক্ষ সালিশকারী হিসেবে পাকিস্তানের অবস্থান শক্ত করতে সাহায্য করেছে।
এছাড়া ইরানের পর পাকিস্তানেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে (যার মধ্যে গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি অন্তর্ভুক্ত)। গত সপ্তাহে ইরানি নববর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করে বলেন যে, পাকিস্তানের জনগণের প্রতি তার বিশেষ অনুভূতি রয়েছে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অন্যান্য পক্ষ
পাকিস্তানের মধ্যস্থতা এবং ট্রাম্পের 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ইরানের পাওয়ার গ্রিডে হামলার হুমকি স্থগিত করার পোস্টের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়। তবে একজন ইউরোপীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো সরাসরি আলোচনা না হলেও মিশর, পাকিস্তান এবং উপসাগরীয় দেশগুলো বার্তা আদান-প্রদান করছে।
তুরস্কও যুদ্ধের আগে থেকেই মধ্যস্থতার চেষ্টায় জড়িত ছিল এবং একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে ইরানি কর্মকর্তা ও ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে কথা বলছে বলে জানা গেছে।
ট্রাম্প শিবিরের প্রতিক্রিয়া
হোয়াইট হাউস ট্রাম্পের এই আলোচনা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শান্তি প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট আইএএনএসকে বলেন, এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্র সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো আলোচনা করবে না।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কম
যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে গড়ালে বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা যেকোনো মধ্যস্থতার সাফল্যের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে’ জানিয়েছেন যে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের বার্তা আদান-প্রদান, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়।
চ্যাথাম হাউস থিংক ট্যাঙ্কের সানাম ভাকিল বলেন, বেশ কিছু দেশ সংঘাত প্রশমনে ‘আপ্রাণ চেষ্টা’ করছে, তবে ‘আমি একে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো সংকেত হিসেবে দেখছি না।’
ভাকিল মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর চাপের কারণে ট্রাম্প তার হুমকি থেকে পিছিয়ে আসতে পারেন। কারণ, ইরান হুমকি দিয়েছে যে তাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কোনো হামলা হলে তারা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো এবং পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে। তিনি আরও যোগ করেন, উভয় পক্ষই হয়তো সমঝোতা ও চুক্তির রূপরেখা নিয়ে ভাবছে, তবে কারো মধ্যেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা আমি দেখছি না। ইরানও নতি স্বীকার করবে বলে মনে হয় না, কারণ তারা মনে করছে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে এবং এটি তাদের টিকে থাকার লড়াই।
সাধারণত ওমান এবং কাতার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে থাকে। তবে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, জেনেভায় ট্রাম্প প্রশাসন ও ইরানি কর্মকর্তাদের আলোচনার দুই দিন পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বড় কোনো গতি আসেনি।