
ফ্রান্সে ১৫ থেকে ১৭ জুন অনুষ্ঠিত হয় জি-৭ এর ৫২তম সম্মেলন। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাতটি শিল্পোন্নত দেশের জোট ‘জি-৭’। এই জোটের সদস্য দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং জাপান। আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটের সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক সময়ে জি-৭-এর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে দেখা যাচ্ছে ভারতকে। এই নিয়ে মোট ১৩ বার জি-৭ বৈঠকে ডাক পেল ভারত। নরেন্দ্র মোদি পরপর সাতবার জি-৭ এর বৈঠকে যোগ দেন। এর আগে, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংও জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে একাধিকবার জি-৭ এবং সম্প্রসারিত জি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন।
যেসব কারণে বিশ্বরাজনীতির এই প্রভাবশালী টেবিলে ভারত এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে তা হল:
গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বর
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বসংস্থাগুলো মূলত পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর আধিপত্যে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভাব-অভিযোগ ও আকাঙ্ক্ষার কথা বৈশ্বিক আলোচনায় খুব একটা গুরুত্ব পেত না। ভারত এখন সেই দেশগুলোর জোরালো কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির ক্ষেত্রে ভারত এখন প্রধান অনুঘটক। কোনো বৈশ্বিক নীতিমালা সফল করতে হলে ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমর্থন এখন অপরিহার্য।
বিশাল অর্থনীতির হাতছানি
১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ভারত এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজার। ডিজিটাল অর্থনীতি, ম্যানুফ্যাকচারিং খাত এবং প্রযুক্তিতে ভারতের দ্রুত অগ্রগতি বিশ্ব নেতাদের নজর কেড়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন সচল রাখতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো এখন ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে।
চীনের প্রভাব মোকাবিলায় কৌশলগত ভারসাম্য
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভাব পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ। ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে চীনকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে রাখার জন্য জি-৭ দেশগুলোর কাছে ভারত এখন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী কৌশলগত সঙ্গী।
জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে ভারতের ভূমিকা
বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে ভারতকে পাশে পাওয়া অপরিহার্য। বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হওয়ার কারণে ভারতের জ্বালানি ব্যবহারের ধরন বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভারত এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স’-এর মতো উদ্যোগ নিয়ে জলবায়ু লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও গণতন্ত্র
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারত তার নিজস্ব স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত বা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার মতো বিষয়ে ভারত প্রথাগত ব্লকের বাইরে গিয়ে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের পক্ষে কথা বলেছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ভারত বিশ্বের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের এক অনন্য সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা বর্তমান সংকটাপন্ন বিশ্বে খুবই মূল্যবান।
শুধুই অতিথি নয়, এখন অংশীদার
জি-৭-এ ভারতের অংশগ্রহণ এখন আর কেবল প্রতীকী নয়। ডিজিটাল অবকাঠামো, খাদ্য নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারত এখন নতুন নতুন সমাধান ও আইডিয়া নিয়ে টেবিলে বসছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একটি বিষয় পরিষ্কার—বৈশ্বিক প্রভাব এখন আর কেবল পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভারতের মতো উদীয়মান শক্তির হাতেই এখন বিশ্বরাজনীতির ভবিষ্যৎ অনেকটা নির্ভর করছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৩ সালে প্যারিসে জি-৭ এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এর প্রথম বৈঠক হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথম বৈঠকে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালি, ফ্রান্স এবং জাপান ছিল। পরের বছর যোগ দেয় কানাডা। ১৯৭৭ সালের জি-৭ বৈঠকে যোগ দিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নও। তাদের সদস্য এখনও এই বৈঠকে উপস্থিত থাকে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আলাদা করে জি-৭ এর সদস্য হয়নি।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি