
যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করা নারী বন্দী মারিয়া পিয়ারসন প্রায় চার দশক কারাগারে কাটানোর পর মুক্তি পেতে যাচ্ছেন। তবে তার মুক্তির সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু ঝুঁকি মূল্যায়নে এখনো তাকে ‘গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে সক্ষম’ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে ৭০ বছর বয়সী পিয়ারসন ১৯৮৬ সালে নিজের সাবেক প্রেমিকের নতুন সঙ্গী জ্যানেট নিউটনকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে গ্রেফতার হন। ১৯৮৭ সালে আদালত তাকে হত্যার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ন্যূনতম ১২ বছরের কারাদণ্ড দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একের পর এক প্যারোল আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় তিনি প্রায় ৩৯ বছর কারাগারেই কাটিয়ে দেন। দীর্ঘ এই বন্দিজীবনের কারণে মানবাধিকারকর্মীদের কেউ কেউ তাকে যুক্তরাজ্যের ‘ভুলে যাওয়া বন্দী’ বলেও অভিহিত করেছিলেন। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সাবেক সঙ্গী ম্যালকম পিয়ারসনের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর মারিয়া চরম ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন। পরে ম্যালকম জ্যানেট নিউটনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে তিনি দীর্ঘদিন তাদের অনুসরণ ও হয়রানি করতে থাকেন। ১৯৮৬ সালের ১৯ অক্টোবর, সাবেক প্রেমিকের বাগদানের মাত্র দুই দিন পর রাস্তায় জ্যানেটের মুখোমুখি হয়ে তাকে ছুরিকাঘাত করেন। মাত্র ২৩ বছর বয়সী জ্যানেটের বুকে ১৭টি ছুরিকাঘাত করা হয়, যার একটি আঘাত তার হৃদ্পিণ্ড ভেদ করে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। সম্প্রতি প্যারোল বোর্ড পিয়ারসনের মুক্তির অনুমোদন দিয়েছে। তবে বোর্ড এই সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত’ বলে উল্লেখ করেছে। মুক্তির পর তাকে কঠোর কিছু শর্ত মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত ঠিকানায় বসবাস, প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে থাকা, কারফিউ মেনে চলা, ১২ মাস জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের আওতায় থাকা এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করা। এদিকে নিহত জ্যানেট নিউটনের পরিবার এই মুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছে। জ্যানেটের বোন লিন নিউটনের দাবি, মারিয়া এখনো সমাজের জন্য বিপজ্জনক এবং তিনি কখনোই নিজের অপরাধের জন্য সত্যিকারের অনুতাপ প্রকাশ করেননি। তার ভাষায়, পিয়ারসনের মুক্তির সম্ভাবনা এখনো তাদের পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। প্যারোল শুনানিতে মনোবিজ্ঞানীদের মতামতও ছিল বিভক্ত। একজন বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যতে তাকে গুরুতর অপরাধের মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকির ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করলেও অন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ তদারকি ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা গেলে তার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার নথি এবং দীর্ঘ মূল্যায়ন পর্যালোচনার পর প্যারোল বোর্ড সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে জননিরাপত্তার স্বার্থে তাকে আর কারাগারে রাখা প্রয়োজন নেই এবং ভবিষ্যতে গুরুতর সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। মারিয়া পিয়ারসনের মুক্তি তাই একদিকে প্রায় চার দশকের কারাবাসের সমাপ্তি, অন্যদিকে এটি যুক্তরাজ্যের বিচারব্যবস্থা, জননিরাপত্তা এবং অপরাধীদের পুনর্বাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।