শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত না করা মোদির পুরোনো কৌশলেরই অংশ

আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ২৩ জুলাই ২০২৬, ২৩:৪৩

ভারতে একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গন। তরুণদের নতুন সামাজিক আন্দোলন ‘ককরোচ মুভমেন্ট’-এর হাজার হাজার সমর্থক দেশের রাজধানী নয়া দিল্লিতে মাসব্যাপী অবস্থান ধর্মঘট পালন করছেন। 
পুলিশি লাঠিচার্জ এবং টিয়ার গ্যাসের জবাবে শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হওয়ার পরও পিছু হটেননি বিক্ষোভকারীরা। তবে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ও বিরোধী দলগুলোর টানা চাপের মুখেও স্বস্থানে অটল রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। আপাতদৃষ্টিতে এটি নজিরবিহীন মনে হলেও, নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনকালের রাজনৈতিক ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—চাপের মুখে সহকর্মীদের বরখাস্ত না করার এই অবস্থান তার পুরনো কৌশলেরই একটি অংশ।

রাজপথের তীব্র গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপ
জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের পরিচালিত এই আন্দোলন মোদির টানা তৃতীয় মেয়াদের শাসনের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলোও এই রাজপথের আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে রাজপথে নেমেছে এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে জোরালো করেছে।
বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণত বড় ধরণের গণবিক্ষোভ বা বিতর্ক তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কিংবা সরকারপ্রধান পদত্যাগ করেন। কিন্তু ভারতে এ চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজের পদে বহাল রয়েছেন এবং সরকারও তার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।

১২ বছরের চেনা রাজনৈতিক ধাঁচ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চাপের মুখে কাউকেই সরান না মোদি—এটি তার শাসনের ১২ বছরে বারবার দেখা গেছে। এর আগে একাধিক বড় বিতর্ক ও ঘটনার পরও তিনি কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে গণদাবির মুখে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেননি।
যেমন, ২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে গোমাংস রাখার গুজবে মোহাম্মদ আখলাক নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী মহেশ শর্মা ওই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘দুর্ঘটনা’ বলে অভিহিত করেন। 
পরবর্তীতে তিনি ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত ব্যক্তির কফিনে জাতীয় পতাকা জড়ানো অবস্থায় শ্রদ্ধাও জানান। দেশজুড়ে পদত্যাগের তীব্র দাবি উঠলেও মোদি তাকে বহাল রাখেন। অবশেষে ২০১৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পরই তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
একইভাবে ২০১৬ সালে হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি ও শ্রম মন্ত্রী বান্দারু দত্তাত্রেয়ের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। তা সত্ত্বেও দুজনকেই মন্ত্রিসভায় রেখে দেওয়া হয়, পরবর্তীতে স্মৃতি ইরানিকে অন্য মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২১ সালে উত্তর প্রদেশের লখিমপুর খেরিতে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র তেনির ছেলে আশিস মিশ্রের নাম আসে। ৪ জন কৃষকসহ একাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় তেনির পদত্যাগের দাবি উঠলেও ২০২৪ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি স্বস্থানে বহাল ছিলেন।

একমাত্র ব্যতিক্রম ও বিরোধীদের সঙ্গে বৈপরীত্য
নরেন্দ্র মোদির পুরো শাসনকালে পদত্যাগের একমাত্র বড় ব্যতিক্রম ছিল করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর। কোভিড ব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. হর্ষ বর্ধন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং পরে রাজনীতি থেকেও বিদায় নেন।
মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এই নীতি তাদের পূর্ববর্তী কংগ্রেস সরকারের শাসনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কংগ্রেস আমলে সরকারের বিরুদ্ধে গণদাবি উঠলে কিংবা কোনো বড় বিতর্ক দেখা দিলে স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে দেখা যেত। কিন্তু মোদির শাসনব্যবস্থায় রাজপথের চাপের মুখে নতি স্বীকার না করার এই মনোভাবকেই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।