
স্পেন জানিয়েছে, উত্তর আফ্রিকার ছিটমহল সেউটায় তৈরি হওয়া সংকট এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত কয়েক দিনে সীমানা পেরিয়ে ঢুকে পড়া ৫০ হাজারেরও বেশি অভিবাসীর অধিকাংশই স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) হাজার হাজার মানুষ সেউটায় প্রবেশ করে এবং শুক্রবার রাতভর এই ঢল অব্যাহত ছিল। সীমান্ত বেড়া এড়াতে তাদের বেশিরভাগই সাঁতার কেটে বা ছোট নৌকায় করে সমুদ্রপথে আসে। কেউ কেউ সীমান্ত পারাপার কেন্দ্রগুলোতে এত বিপুল সংখ্যায় ছুটে আসে যে প্রহরীরা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। অন্যরা সীমান্ত বেড়ার সুরক্ষায় থাকা সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার বাঁধ (ব্রেকওয়াটার) বেয়ে ওঠার চেষ্টা করে। সেউটায় পৌঁছানোর এই মরিয়া চেষ্টায় অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এত বিপুল সংখ্যক মানুষ কেন হঠাৎ করে অবৈধভাবে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করল, তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। তারা সবাই একই দিনে এই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এটি স্পষ্টতই কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এটি কি পূর্বপরিকল্পিত ও সমন্বিত ছিল? যদি তা-ই হয়, তবে এর পেছনে কারা এবং তাদের উদ্দেশ্যই বা কী?
সেউটা কোথায় এবং এর গুরুত্ব কী?
সেউটা হলো মরক্কো সীমান্তবর্তী উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। মেলিলার পাশাপাশি এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আফ্রিকার মধ্যে থাকা মাত্র দুটি স্থল সীমান্তের একটি।
১৪১৫ সালে পর্তুগিজদের শাসনাধীনে আসার পর, ১৫৮০ সালে এটি স্পেনের অংশে পরিণত হয়। ১৬৪০ সালে পর্তুগাল স্বাধীনতা ফিরে পেলেও এটি স্পেনের সার্বভৌমত্বেই থেকে যায়। আফ্রিকা মহাদেশ উপনিবেশমুক্ত হওয়ার পর সেউটা এবং মেলিলা-ই আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে থাকা একমাত্র ইউরোপীয়-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল।
এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি ইউরোপে পৌঁছাতে চাওয়া অভিবাসী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। এই ছিটমহলটি উঁচু সীমান্ত বেড়া, নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্পেনের সিভিল গার্ড ও ন্যাশনাল পুলিশের স্থায়ী পাহারায় সুরক্ষিত থাকে।
হঠাৎ এই বিপুল অভিবাসীর ঢল কেন?
সেউটার কর্তৃপক্ষ অনুপ্রবেশের এই আকস্মিক বৃদ্ধির জন্য জুলাই মাসে প্রকাশিত স্প্যানিশ সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে দায়ী করেছে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠাতে পারবে না। তবে সীমান্ত বেড়া টপকে বা স্থলপথে স্পেনে প্রবেশকারী অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।
তবে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ এই তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, খুব কম সংখ্যক অভিবাসীই আদালতের এ রায় সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
উত্তর আফ্রিকার অভিবাসন বিষয়ক স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগনাসিও সেমব্রেরো বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ৮ জুলাইয়ের রায়টি একটি ভূমিকা পালন করেছে... তবে এটি এত বিপুল পরিমাণ মানুষের জড়ো হওয়াকে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এ আকস্মিক অনুপ্রবেশের জন্য মানব পাচারকারী মাফিয়াদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, তারা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের তাৎপর্যকে অতিরঞ্জিত করে বিপুল সংখ্যক অভিবাসীকে সেউটায় গণ-অনুপ্রবেশে অংশ নিতে প্ররোচিত করেছিল।
তবে অনেকের ধারণা, হঠাৎ করে সীমান্ত লঙ্ঘনের এ গণ-ঘটনাটি সংগঠিত করা এবং এর সুযোগ করে দেওয়ার পেছনে মরক্কোর হাত থাকতে পারে।
এর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক কী?
কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, মরক্কো যদি এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেও থাকে, তবে এর পেছনে অন্যদের ইন্ধন থাকতে পারে। স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী সানচেজের ওপর বিশেষ ক্ষোভ রয়েছে এমন দুজন নেতার দিকে তারা ইঙ্গিত করছেন—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
সানচেজের ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান
সানচেজ ইউরোপের সবচেয়ে ধারাবাহিক ফিলিস্তিনপন্থি কণ্ঠস্বরগুলোর একটি। তিনি স্পষ্টভাবে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধকে গণহত্যা বলেছেন, ইরান-ইসরাইল মার্কিন যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং স্পেনের সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
মরক্কো-ইসরাইল সখ্যতা
স্পেনের তুলনায় মরক্কো ইসরাইলের প্রতি অনেক বেশি বন্ধুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে স্পেন ইসরাইলের জন্য অস্ত্র বহনকারী মার্কিন পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজকে আলজেসিরাসে নোঙর করতে দেয়নি, তখন জাহাজটি মরক্কোর দিকে মোড় নেয়।
ইসরায়েলিদের ক্ষোভ
অনেক ইসরাইলি স্পেনের ফিলিস্তিন সমর্থনকে কপটতা বলে মনে করেন, কারণ স্পেন নিজেও আরব ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। ২০১৯ সালে নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়ার সেউটা ও মেলিলার একটি মানচিত্র টুইট করে বলেছিলেন, প্রিয় আরব ও মুসলিমরা। অধিকৃত আরব ইসলামিক ভূমি মুক্ত করতে চান? এখান থেকে দারুণ একটি শুরু হতে পারে!
সাম্প্রতিক উস্কানি
শুক্রবার সেউটায় হাজার হাজার অভিবাসী ঢুকে পড়ার পর জাতিসংঘে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এক্সে একটি উসকানিমূলক মন্তব্য করেন। তিনি লেখেন, স্পেন, যারা ইসরাইলকে জ্ঞান দেওয়ার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না, তারা তাদের অভিবাসন নীতি নিয়ে সংকটের পর সেউটায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। আমাদের জ্ঞান দেওয়া চালিয়ে যাওয়ার আগে, স্পেনের উচিত বিশ্বকে ব্যাখ্যা করা যে কেন তারা এখনো আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক ছিটমহল ধরে রেখেছে।
স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে এর জবাবে বলেন, বেশ, সবকিছু এখন বেশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। এর মাধ্যমে তিনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন যে সেউটায় যা ঘটেছে তার পেছনে ইসরাইলের হাত রয়েছে।
মরক্কোয় ইসরাইলপন্থি মনোভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে যখন থেকে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। কয়েকদিন আগেই ঘোষণা করা হয় যে মরক্কো পশ্চিম সাহারার ওপর দিয়ে যাওয়া ১,০৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মহাসড়কের নামকরণ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই পদক্ষেপটি মোটেও আশ্চর্যজনক নয়, কারণ ২০২০ সালে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর একটি ছিল মরক্কো, যার মাধ্যমে তারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। এর বিনিময়ে ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘে এবং দ্বিপাক্ষিক চ্যানেলের মাধ্যমে মরক্কোকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়েছে।
মরক্কো আংশিকভাবে ইসরাইলের পক্ষে সেউটার ঘটনাগুলো পরিচালনা করেছে—এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই, তবে এখানে অনেকগুলো কৌতূহলোদ্দীপক কাকতালীয় বিষয় রয়েছে।
তবে এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র থাকুক বা না থাকুক, এই ঘটনার একটি পরিণতি স্পষ্ট—সানচেজের বামপন্থি স্প্যানিশ সরকার এবং নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থি ইসরাইলি সরকারের মধ্যে এমনিতেই যে শীতল সম্পর্ক ছিল, তা এখন আরও বেশি বরফশীতল হয়ে উঠেছে।
সূত্র: আলজাজিরা, এএফপি