
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের এক ছোট অ্যাপার্টমেন্টের রান্নাঘরের টেবিলে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন ৩৭ বছর বয়সি মারিয়া। রাশিয়া সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে যখন তাকে জানানো হয় যে, ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে তার ৫৯ বছর বয়সি বাবা ইউরি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন, তখন তিনি মারাত্মক ধাক্কা পান। খবর সিএনএনের।
মারিয়া জানতেনই না যে তার বাবা সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন। তবে তার চেয়েও বড় ধাক্কাটি আসে যখন তিনি জানতে পারেন, যুদ্ধে পাঠানোর মাত্র দুই দিন আগে তার বাবা বিয়ে করেছিলেন।
মারিয়া বলেন, ‘আমি এখনো স্তব্ধ। প্রথমে মনে হয়েছিল কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছি। কিন্তু বাস্তবেও এমনটি ঘটেছে।’
বাবার মৃত্যুর পর মারিয়া জানতে পারেন, যে নারীকে তার বাবা বিয়ে করেছিলেন তিনি মারিয়ার থেকেও বয়সে ছোট এবং তার বাবা ইউরির চেয়ে ২২ বছরের ছোট। এই নারীকে মারিয়া কখনো দেখেননি, এমনকি বাবার মুখে তার নামও শোনেননি। কিন্তু কাগজে-কলমে এই নারী এখন ইউরির আইনি উত্তরাধিকারী। ফলে আইন অনুযায়ী সরকারের দেওয়া আনুমানিক ক্ষতিপূরণের পুরো টাকার মালিক এখন ওই নতুন স্ত্রী।
মারিয়া বলেন, ‘আমি ওই মহিলার সঙ্গে কখনো কথা বলিনি। এটি জানার পর থেকেই আমার সন্দেহ হয়েছিল, এটি একটি প্রতারণা।’
বিয়ে ও ‘ব্ল্যাক উইডো’ বাণিজ্য
রাশিয়ায় যুদ্ধে কোনো সেনা নিহত হলে তার পরিবার বা আইনি উত্তরাধিকারীকে এককালীন অন্তত ৫০ লাখ রুবল (প্রায় ৬৪ হাজার ডলার) দেয় সামরিক বাহিনী। কিন্তু এই সুযোগটিকেই এখন পুঁজি করেছে এক শ্রেণির অসাধু চক্র, যাদের রাশিয়ার কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘ব্ল্যাক উইডো’ বা ‘কালো বিধবা’ নামে ডাকছে। এরা অসহায় ও একা পুরুষদের ভুয়া বিয়ের ফাঁদে ফেলে যুদ্ধে পাঠিয়ে দেয়। সেনা সদস্য নিহত হলে ক্ষতিপূরণের অর্থ তারা হাতিয়ে নেয় এবং রক্তের সম্পর্কের স্বজনদের বঞ্চিত করে।
সম্প্রতি রাশিয়ায় এমন একাধিক ঘটনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। একটি সামরিক হাসপাতালে কর্মরত এক নার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া পাঁচজন জখম সেনাকে বিয়ে করে তাদের মৃত্যুর পরবর্তীতে প্রাপ্ত অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এমনকি সিবেরিয়ার তোমস্ক শহরের এক রিয়েল এস্টেট এজেন্টের ভিডিও পডকাস্ট ভাইরাল হলে চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে মেরিনা অরলোভা নামের এক এজেন্ট পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘টাকা পাওয়া খুব সহজ। ইউক্রেন যুদ্ধে যাওয়া কোনো পুরুষকে খুঁজে বের করে বিয়ে করুন। সে মারা গেলে ৮ লাখ রুবল পেয়ে যাবেন। অনেকেই এখন এভাবে সস্তায় ফ্ল্যাট কিনছেন, এটা একটা ব্যবসা।’
পরবর্তীতে ওই এজেন্ট ও সঞ্চালককে সাজা দেয় দেশটির আদালত।
সামরিক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আক্রমণের পর ক্রেমলিন সেনাসদস্যদের দ্রুত বিয়েতে উৎসাহিত করেছিল। দ্রুত বিয়ের নিয়ম শিথিল করার সুযোগটিকেই কাজে লাগায় এসব প্রতারক চক্র।
তবে কেবল সাধারণ নারীই নয়, এতে উঠে এসেছে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগও। প্রিমোরস্কি ক্রাই অঞ্চলে একটি প্রতারক চক্রের তদন্তে জানা যায়, সেনাবাহিনীর একজন ওয়ারেন্ট অফিসার, সার্জেন্ট ও হিসাবরক্ষক মিলে এতিম ও নিঃসঙ্গ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে বিয়ের আয়োজন করতেন। এরপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ওই সেনাদের অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতেন, যাতে তারা দ্রুত মারা যায় এবং বীমার টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়।
সেন্ট পিটার্সবার্গে বাবার বিক্রি হয়ে যাওয়া পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে মারিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার কাছে বাবাকে মনে রাখার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, কেবল এই বাড়ির অকেজো চাবিটা ছাড়া।’