সাব-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ারঃ বৃষ্টিস্নাত শ্রাবণের বিকালে নতুন ধরনের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা

মোঃ বায়েজিদ সরোয়ার
ডেস্ক রিপোর্ট
  ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৮

বিশ্বকাপ ফুটবলের অনুপম উন্মাদনা শেষে, শ্রাবণের এক বৃষ্টিস্নাত বিকাল। গত ২১ জুলাই ২০২৬, ঢাকার গুলশান-২ এর হোটেল বেঙ্গল ব্লুবেরীতে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ’(বিআইপিএসএস/বিপস) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থিত হলাম। অনুষ্ঠানে ব্লুবেরী এমনকি মৌসুমী আমের দেখাও মিললো না। তবে ‘সাব-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার’ নামে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত নতুন ধরনের যুদ্ধ /সংঘাত নিয়ে প্রাণময় আলোচনা উপস্থিত সবার চিন্তার জগতে বেশ আলোড়ন তোলে।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য সাব-থ্রেশহোল্ড যুদ্ধের গতিশীলতা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় দেশের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানান তারা। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বাংলাদেশে বিদ্যায়তনিক পরিসরে সাব-থ্রেশহোল্ড যুদ্ধকে জনসম্মুখে আলোচনায় আনার ক্ষেত্রে বিআইপিএসএস সম্ভবত পথিকৃৎ।

ব্যাংকোয়েট হলে এক ইন্টেলেক্চুয়াল এক্সারসাইজ 
সেদিন হোটেলটির ব্যাংকোয়েট হলে ‘Sub-threshold Conflict: War by Other Means’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে বিপস। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস। সমসাময়িক সংঘাতের পরিবর্তিত প্রকৃতি এবং বাংলাদেশ ও বৃহত্তর অঞ্চলের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আয়োজিত এ আলোচনায় শিক্ষক, কূটনীতিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, গবেষক, সুশীল সমাজ এবং শীর্ষস্থানীয় থিংক ট্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভাপতির দীপ্তিময় প্রারম্ভিক বক্তব্য
অধিবেশনটি পরিচালনা করেন বিপস-এর সভাপতি মেজর জেনারেল এএনএম মুনিরুজ্জামান (অব.)। সামরিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই বিশ্লেষক বর্তমানে Global Military Advisory Council on Climate Change-এর চেয়ারম্যান।
উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সাব-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাইবার অভিযান, অর্থনৈতিক জবরদস্তি, অপতথ্য প্রচার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের মতো কার্যক্রম এখন প্রচলিত যুদ্ধের সীমা অতিক্রম না করেই রাষ্ট্রীয় কৌশলের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ ও শান্তির প্রচলিত বিভাজন আজ আর আগের মতো স্পষ্ট নয়। অতীতে আন্তর্জাতিক আইন, নিরাপত্তা জোট ও প্রতিরক্ষা নীতি গড়ে উঠেছিল দৃশ্যমান সশস্ত্র আগ্রাসনের ধারণাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর সংঘাত সেই কাঠামোকে বদলে দিয়েছে।
জেনারেল মুনিরের ভাষায়, সাব-থ্রেশহোল্ড যুদ্ধ যা অনেক সময় গ্রে-জোন ওয়ারফেয়ার নামেও পরিচিত হলো এমন সব অপ্রচলিত কৌশলের প্রয়োগ, যা প্রচলিত সামরিক প্রতিক্রিয়ার সীমার ঠিক নিচে অবস্থান করে কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করে। প্রতিপক্ষ যদি সমাজের ভেতরের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে পারে, তাহলে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে জড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।
তিনি বলেন, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অস্পষ্টতা। সাইবার অনুপ্রবেশ, অর্থনৈতিক চাপ, প্রক্সি শক্তির ব্যবহার কিংবা অপতথ্য প্রচারের মাধ্যমে এমন ক্ষতি করা হয়, যার বিরুদ্ধে প্রচলিত প্রতিরোধ নীতিমালা কার্যকর প্রতিক্রিয়া নির্ধারণে প্রায়ই হিমশিম খায়।

প্রয়োজন নতুন নিরাপত্তা ধারণা
জেনারেল মুনিরের মতে, এই বাস্তবতায় কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমগ্র-সমাজভিত্তিক (Whole-of-Society) নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি। এজন্য সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা এবং শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে নাগরিকদের জ্ঞানগত সহনশীলতা (Cognitive Resilience) গড়ে তোলা অপরিহার্য। এখন প্রয়োজন নতুন নিরাপত্তা ধারণা (সিকিউরিটি কোড)।
তিনি বলেন, আধুনিক সংঘাতের সম্মুখভাগ আর কেবল ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; তা বিস্তৃত হয়েছে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, অর্থনীতি এবং নাগরিকদের মনোজগতে। তাই এই অদৃশ্য রণাঙ্গনকে চিহ্নিত করা এবং তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

আলোকিত এক প্রবন্ধের ভুবনে
এরপর অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস “Living Below the Line: Sub-threshold Warfare and the Erosion of Strategic Certainty” শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি সাব-থ্রেশহোল্ড সংঘাতকে এমন এক ধারাবাহিক কৌশলগত সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে তথ্য, সাইবার, অর্থনৈতিক ও আধাসামরিক উপায় ব্যবহার করে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র-সমর্থিত পক্ষ প্রচলিত যুদ্ধের সীমার নিচে থেকেই উল্লেখযোগ্য কৌশলগত প্রভাব সৃষ্টি করে। তাঁর উপস্থাপনায় সাব-থ্রেশহোল্ড যুদ্ধের বিবর্তন, সমসাময়িক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় এর গুরুত্ব এবং সাইবার আক্রমণ, অপতথ্য, অর্থনৈতিক চাপ ও প্রক্সি ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো কীভাবে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়।

ইউরোপের রণাঙ্গন থেকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস তাঁর মূল বক্তব্যে সাব-থ্রেশহোল্ড যুদ্ধের বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি ২০২৪ সালে বাল্টিক সাগরের তলদেশে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাকে (Baltic Seabed Puzzle) উল্লেখ করেন। ঘটনার পর ন্যাটো ওই অঞ্চলে নৌ টহল জোরদার করলেও কোনো গুলি ছোড়া হয়নি, কোনো রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকারও করেনি। তবুও কয়েকটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এর পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা ছিল।
এরপর তিনি ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত সাব-থ্রেশহোল্ড কার্যক্রমের আরও কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেন। আলোচনার পরিসরে উঠে আসে ক্রিমিয়া, এস্তোনিয়ায় সাইবার অভিযান, বাল্টিক অঞ্চলের অবকাঠামো নিরাপত্তা, দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা এবং আফ্রিকার কিছু দেশে পরিচালিত অপতথ্য প্রচারণা। এই তরুণ অধ্যাপকের বর্ণনার সাবলীলতায় আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মানস ভ্রমণ করেন ঢাকা থেকে ইউরোপ-আফ্রিকার রণাঙ্গনে। এসব ঘটনার একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো সংঘাতের তীব্রতা থাকলেও তা প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নেয় না; অভিযুক্ত পক্ষ দায় অস্বীকার করে, আর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও সীমিত থাকে। এটাই সাব-থ্রেশহোল্ড সংঘাতের সবচেয়ে জটিল দিক।

সাব-থ্রেশহোল্ড কার্যক্রম : বাংলাদেশের প্রেক্ষিত
অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, সাব-থ্রেশহোল্ড কার্যক্রম শুধু সামরিক নয়; এটি আইনি, কৌশলগত ও অপারেশনাল চ্যালেঞ্জও তৈরি করে। বিশেষ করে দায় নির্ধারণ (Attribution), প্রতিরোধ (Deterrence) এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ এসব ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, সম্প্রসারণশীল ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক অর্থনীতি ভবিষ্যতে নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে। তাই জাতীয় প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা, তথ্যগত সহনশীলতা (Resilience) এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক নিলয় কক্সবাজারের সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং অপতথ্যের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে এখন থেকেই সাব-থ্রেশহোল্ড হুমকি মোকাবিলায় সুসংগঠিত প্রস্তুতি নিতে হবে। 

প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব
মূল উপস্থাপনার পর অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সাইবার সহনশীলতা এবং কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা করেন। আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতিনির্ধারক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং সুশীল সমাজের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ ও ধারাবাহিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

সমাপনী বক্তব্য : আগামীর দিশা
সমাপনী বক্তব্যে বিপস-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাফকাত মুনির বলেন, সংঘাতের পরিবর্তিত চরিত্রের কারণে বাংলাদেশকে তার নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তাঁর মতে, উন্নত সাইবার নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা, গণমাধ্যম সাক্ষরতা এবং কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে জাতীয় সহনশীলতা (National Resilience) জোরদার করাই সময়ের দাবি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আধুনিক সংঘাতের রণাঙ্গন এখন ভৌগোলিক সীমান্ত ছাড়িয়ে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, আর্থিক ব্যবস্থা ও তথ্যপরিসরে বিস্তৃত হয়েছে।
এই তরুণ গবেষক বলেন, “আজকের আলোচনা একটি কঠোর বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। সংঘাতের চরিত্র মৌলিকভাবে বদলে গেছে। কার্ল ফন ক্লজউইৎস যুদ্ধকে ‘অন্য উপায়ে রাজনীতির ধারাবাহিকতা’ বলেছিলেন। আজ সেই ‘অন্য উপায়’ পরিচালিত হচ্ছে ছায়ার আড়ালে। সাপ্লাই চেইনের অস্ত্রায়ন, সাইবার অনুপ্রবেশ এবং সমন্বিত অপতথ্য প্রচারণাই হয়ে উঠেছে নতুন রণাঙ্গন।”
শাফকাত মুনিরের মতে, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত অবস্থান এবং দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে বাংলাদেশও এই নতুন ধরনের সংঘাতের বাইরে নয়। তাই নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশলকে ‘প্রতিরোধের মাধ্যমে নিবৃত্ত ‘ (Deterrence by Resilience) ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে—অর্থাৎ রাষ্ট্রকে এমনভাবে সক্ষম ও সহনশীল করতে হবে, যাতে তাকে সহজে অস্থিতিশীল করা না যায়।

বাংলাদেশের এখন যা করণীয়
ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির বিষয়ে গবেষক-বিশ্লেষক শাফকাত মুনির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন। প্রথমত, নিরাপত্তাকে কেবল সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে না দেখে একটি সমগ্র-সমাজভিত্তিক (Whole-of-Society) দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থা  এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জনগণের মনোজগৎকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অপতথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা। তাই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি নাগরিকদের মনস্তাত্ত্বিক সহনশীলতা এবং গণমাধ্যম সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, কৌশলগত কূটনীতিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। পরস্পরবিরোধী স্বার্থে জর্জরিত এই অঞ্চলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমাত্রিক কূটনীতি। সামুদ্রিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে যে কোনো একক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভৌগোলিক অবস্থানকে দুর্বলতা নয়, বরং কৌশলগত সম্পদে রূপান্তর করতে হবে।

শেষের যত কথা
গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের অভিমত ছিল স্পষ্ট সাব-থ্রেশহোল্ড যুদ্ধের প্রকৃতি ও কৌশল না বুঝলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সময় থাকতে নিরাপত্তা অবকাঠামোকে আধুনিকায়ন এবং সমন্বিত জাতীয় প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এই অদৃশ্য সংঘাতকে অবহেলা করার সুযোগ আর নেই।

ধূসর সন্ধ্যায় আলোর সন্ধানে
অনুষ্ঠান শেষে হোটেল ব্লুবেরী থেকে বাইরে এলাম। এখন সন্ধ্যা। না দিন, না রাত। এক অদ্ভুত ধূসর সময়। দীর্ঘ সামরিক জীবনে দেখেছি, অনেক সময় সবচেয়ে বড় বিপদটি আসে নিঃশব্দে; আমরা তা বুঝে ওঠার আগেই সেটি বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়। আজ বাংলাদেশের চারপাশেও নানা ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি, সংঘাত ও প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে, যার অনেকটাই সাব-থ্রেশহোল্ড সংঘাতের মতো অস্পষ্ট, ধূসর এবং নীরব।

থিংক ট্যাংক হোক ভবিষ্যতের বাতিঘর
ঢাকা এখন যেন সেমিনার ও কনফারেন্সের মহানগরী। বাংলাদেশে বিশেষত জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ এর পর নতুন নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও  থিংক ট্যাংক গড়ে উঠছে। এ নিয়ে কিছু সমালোচনাও আছে। তবু আশা করা যায়, এসব প্রতিষ্ঠান কেবল অনুষ্ঠান আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ভাবনা, কৌশলগত গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণে সত্যিকার অর্থেই দেশের বাতিঘর হয়ে উঠবে।
সাব-থ্রেশহোল্ড যুদ্ধের মতো একটি জটিল ও সময়োপযোগী বিষয়কে জনপরিসরে আলোচনায় আনার জন্য বিআইপিএসএস প্রশংসার দাবিদার। এর আগে হাইব্রিড ও গ্রে-জোন ওয়ারফেয়ার নিয়েও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছে। ধারাবাহিক এই উদ্যোগ বাংলাদেশের কৌশলগত চিন্তার পরিসরকে সমৃদ্ধ করবে বলেই প্রত্যাশা।

নতুন সময়, নতুন প্রস্তুতি
সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা বাহিনী, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং সার্বিকভাবে জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করার বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের এসব উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও আশাব্যঞ্জক।
এখন প্রয়োজন নতুন ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি, সংঘাত ও যুদ্ধের প্রকৃতি গভীরভাবে বোঝা এবং সে অনুযায়ী জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলা। কারণ একবিংশ শতাব্দীর অনেক যুদ্ধ আর সীমান্তে শুরু হয় না; শুরু হয় তথ্যে, প্রযুক্তিতে, অর্থনীতিতে এবং মানুষের মনে। 
বাংলাদেশ সেই বাস্তবতাকে যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, ততোই দ্রুত একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও সহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। এগিয়ে যাক আমাদের নিরাপদ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক, বিশ্লেষক।