
ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ক্রমশ বিস্তৃত হওয়া বিক্ষোভের মধ্যে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তেজনাকর হয়ে উঠেছে। সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে গেলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একের পর এক পোস্টে খামেনি ট্রাম্পকে আক্রমণ করেন। বিক্ষোভকারীদের বিদেশি মদদপুষ্ট আখ্যা দেন এবং নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে কঠোর দমন-পীড়নের ইঙ্গিত দেন। এর পাল্টা জবাবে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই সতর্ক করেছেন—ইরানে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র “ভীষণ কঠোর” প্রতিক্রিয়া দেখাবে। একই সময়ে তেহরানে ইন্টারনেট ও ফোন যোগাযোগ বন্ধ, শতাধিক শহরে বিক্ষোভ, প্রাণহানি ও গণগ্রেপ্তারের খবর পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
খামেনির বক্তব্যে পুরোনো শত্রুতার সুর স্পষ্ট। তিনি ট্রাম্পকে প্রাচীন শাসক ও ১৯৭৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত শাহ পাহলভির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, “তারও পতন ঘটবে।” ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে যুক্তরাষ্ট্রকে তেলের জন্য দেশ ধ্বংসকারী শক্তি হিসেবে চিত্রিত করেন। অন্যদিকে ট্রাম্প ইরানি বিক্ষোভকারীদের “নিজেদের দেশের জন্য দাঁড়ানো নিরস্ত্র মানুষ” বলে বর্ণনা করেন এবং দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতি নজিরবিহীন। এই কথার লড়াইয়ের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, কয়েক ডজন মানুষ নিহত ও দুই হাজারের বেশি গ্রেপ্তার হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্পর্কের এই উত্তেজনার পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক বৈরী। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার, ইসরায়েল ইস্যু—সব মিলিয়ে দশকের পর দশক ধরে সংঘাত জমাট বেঁধে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, ইসরায়েল–ইরান সংঘর্ষ এবং ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়েছে। খামেনির বক্তব্যে সেই সব ঘটনার রেশ স্পষ্ট। আর ট্রাম্প প্রশাসনের ভাষায় “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির কড়াকড়ি প্রয়োগও এতে জ্বালানি জুগিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি সরাসরি যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে—এমন আশংকা করা গেলেও নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। বাস্তবতা হলো, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে যদি ইরান অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে এবং প্রাণহানি বাড়ে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক চাপের পাশাপাশি সীমিত সামরিক বা সাইবার পদক্ষেপের পথেও হাঁটতে পারে। এটি বিশ্লেষকদের একটি সম্ভাব্য আশঙ্কা। একই সঙ্গে ইরানও আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, যা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়াবে। এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র নয়—এর ঢেউ পড়তে পারে জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে। পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে বিক্ষোভ দমনের মাত্রা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দুই পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। এ মুহূর্তে পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক এক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।