
‘বাবা তুমি কখন আসবা’? -আর কোনোদিন শোনা যাবে না সেই ডাক। ঢাকার মিরপুরের পল্লবীর ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে এখন নিস্তব্ধতা। দুদিন আগেও যে ঘরে হাসি, পড়াশোনা আর বাবাকে ফোন করার অপেক্ষায় থাকত সাত বছরের রামিসা আক্তার, আজ সেই ঘর শোকাচ্ছন্ন।
রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি বিচার চাই না… আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও তো আর ফিরে আসবে না।’
শিশু রামিসার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবার সামনে এসেছে ভয়ংকর এক বাস্তবতা। গত ১০ দিনে অন্তত চার শিশু ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং সামাজিক, আইনি ও মানসিক সংকটের সম্মিলিত প্রতিফলন।
স্বজনরা জানান, সোমবার (১৮ মে) রাত পর্যন্ত সবকিছু ছিল স্বাভাবিক। স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সকালে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায়নি। মায়ের সন্দেহ ছিল রামিশা পাশের ফ্ল্যাটেই আছে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। পরদিন মঙ্গলবার (২০ মে) সকালে স্বজনদের চিৎকারে লোকজন জড়ো হলে দরজা ভেঙে পাওয়া যায় শিশুটির মস্তকবিহীন মরদেহ।
পুলিশ জানায়, শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণ শেষে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। পরে মরদেহ গুম করতে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। শরীর টুকরা করার চেষ্টাও চলছিল। স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের তথ্য অনুযায়ী ঘটনার সাত ঘণ্টার মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত প্রতিবেশী সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরইমধ্যে আদালতে সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, অভিযুক্তের আচরণ বিকৃত যৌন প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, মাদক সেবন, অপরাধ প্রবণতা এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবের কারণেই সমাজে এমন জঘন্য অপরাধ বাড়ছে। এছাড়া যথাযথ আইনের প্রয়োগ না হওয়ার কারণেও এমন অপরাধ বাড়ছে। আইনের প্রয়োগ দুর্বল হলে কিংবা কেউ নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবে শক্তিশালী ব্যক্তিগত মূল্যবোধ থাকলে সুযোগ থাকলেও অনেক মানুষ অপরাধ থেকে বিরত থাকে।
গত ১৬ মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের খাসকান্দি মদিনা পাড়া গ্রামে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত শিশুটির সৎ মামা রাজা মিয়াকে (৩৫) গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
দিনাজপুরে ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে ১২ বছরের এক শিশু। প্রতিবেশী ৬৫ বছর বয়সী নূর ইসলাম নামে এক ব্যক্তি শিশুটিকে ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ৬ মে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদে ৪ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় জড়িত শিশুটির প্রতিবেশী ও দূরসম্পর্কের চাচা জাকির হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নিহত শিশু ফাহিমা সিলেট সদর উপজেলার সোনাতলা গ্রামের দিনমজুর রাইসুল হকের মেয়ে। গত ৮ মে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে ফাহিমার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার দুদিন আগে সে নিখোঁজ হয়।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন ফাহিমা প্রতিবেশী চাচা জাকিরের ঘরে গেলে সে তাকে ২০ টাকা দিয়ে দোকানে সিগারেট আনতে পাঠায়। সিগারেট নিয়ে ফেরার পর ঘরে কেউ না থাকার সুযোগে শিশুটিকে ধর্ষণ করে জাকির। ফাহিমা অজ্ঞান হয়ে পড়লে ভয় পেয়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করে। হত্যার পর ধরা পড়ার ভয়ে দু’দিন নিজের ঘরের খাটের নিচে একটি সুটকেসে ফাহিমার নিথর দেহ লুকিয়ে রাখে জাকির। পরে মরদেহ থেকে গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে রাতের আঁধারে সেটি বাদাঘাট এলাকার ডোবায় ফেলে আসে।
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুকে শারীরিক নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলেন, আইনের প্রয়োগ দুর্বল হলে কিংবা কেউ নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তবে শক্তিশালী ব্যক্তিগত মূল্যবোধ থাকলে সুযোগ থাকলেও অনেক মানুষ অপরাধ থেকে বিরত থাকে।
তিনি বলেন, শিশু নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার মতো ঘটনায় একক কোনও কারণ কাজ করে না উল্লেখ করে বলেন, এগুলো মাল্টি-ফ্যাক্টরিয়াল সমস্যা। ব্যক্তির মানসিক গঠন, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক বেড়ে ওঠা, আসক্তি বা আচরণগত ত্রুটি। সবকিছু মিলেই অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয়।
প্রতিরোধের উপায় হিসেবে তিনি তিনটি দিকের ওপর গুরুত্ব দেন। কার্যকর আইন প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার, সামাজিকভাবে অপরাধের প্রতি কঠোর নিন্দা এবং পরিবারভিত্তিক মূল্যবোধ শিক্ষা।
তার মতে, অপরাধ ঘটার পর শাস্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ শুরু হয় পরিবার ও শৈশব থেকেই। ছোটবেলায় আচরণগত সমস্যা শনাক্ত করে কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তা দিলে ভবিষ্যতের অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিশুর প্রতি স্বয়িংসতা যেমন বাড়ছে সংখ্যাটা বাড়ছে একই সাথে স্বয়ংসতার যে বিবৎসতা হিংস্র রূপ সেটাও কিন্তু খুব ভয়ঙ্করভাবে নিঃশংস কায়দায় শিশুর প্রতি সহিংসতাগুলো সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, শিশুর প্রতি সংঘাত সহিংসতা গুলোর বিচারে দীর্ঘ সূত্রিতা রয়েছে। কোন কোন ঘটনার বিচারই হয়তো হয় না। বছরের পর বছর কেটে যায় বিচার হয় না। দ্বিতীয়ত হচ্ছে রাষ্ট্র সব শিশু নিরাপত্তার জন্য আইন তৈরি করেছে। কিন্তু সেই আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব রয়েছে।
এমন অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগের জায়গাটা যত বেশি বিলম্ব হবে শিশুর প্রতি সহিংসতার জায়গাটা তত বাড়বে। কারণ আইন আছে, আর যথাযথভাবে তার যদি প্রয়োগ না হয়, তখন শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়বে।
এমন জঘন্য অপরাধ রোধে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার করা প্রয়োজন। বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। রাষ্ট্রের হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতা হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়া। এর মধ্য দিয়ে শিশুর প্রতি সহিসংতার বিচার দ্রুত সময়ের মধ্যে করা।
দোষ স্বীকার করে সোহেল রানার জবানবন্দি, স্ত্রী কারাগারে
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে আসামি সোহেল স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে চাওয়ায় তা রেকর্ডের জন্য আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আবেদন গ্রহণ করে আদালত আসামির জবাননবন্দি রেকর্ড করেন। এ ছাড়া এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঢাকার আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে পৃথক দুই আদালতে দুটি আবেদন দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সোহেল ওই শিশুকে টয়লেটে নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে। পরে তাকে গলা কেটে হত্যা হত্যা করে বলে স্বীকার করেছে।
‘বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না’
নিহত শিশু রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বলেন, আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনও রেকর্ড নেই। গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে মেয়ে রামিসা আক্তারের হত্যার বিচারের আক্ষেপ নিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনও ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।
তিনি বলেন, আমার মাসুমের বাচ্চাটা কি অপরাধ করছে নির্মমভাবে আমার বাচ্চাটারে হত্যা করল। আমারে ফোন করে বলতো ‘বাবা তুমি কখন আসবা’। আটটা বছর আমি আমার বুকের মধ্যে ঘুম পাড়াইছি। আমি আজ কার সাথে ঘুম আসব। আমি কি দিয়ে মনের সান্ত্বনা দিমু। আমার অপরাধ কি? আমার এই মাসুম একটা বাচ্চার কি অপরাধ? আমি এই কলিজাটা ছাড়া আমি থাকবো কেমনে? আমার এই বাচ্চাটা আমি ঘরে ঢোকার আগে ফ্রিজের মধ্যে আমার জন্য শরবত বানায় রাখতো। কি অপরাধ করছি যে, নির্মমভাবে আমার বাচ্চাটারে হত্যা করলো? আমি বাচ্চাটারে ছাড়া আমি থাকবো কেমনে?
আবদুল হান্নান বলেন, দিনে ৫০ থেকে ১০০ টা কল দিতো আমারে। বাবা তুমি কখন আসবা? বাবা তুমি কখন আসবা? বাবা তুমি কখন আসবা? এখন আর কেউ ফোন দিয়ে এভাবে বলবে না।
এদিকে ঘটনার পর থেকেই বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা পারভিন বেগম। মাঝে মাঝে সংবিৎ ফিরে এলে বলছেন, ‘আমার রামিসা কোথায়? ওকে এনে দাও’। কখনোবা বলছেন, ‘আমার মেয়েটা কই? ও স্কুলে যাবে, ভাত খাবে। ও তো একা খেতে পারে না...’
উল্লেখ্য, মঙ্গলবার সকালে পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং পরে বাথরুম থেকে খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, পাশের ফ্ল্যাটের বাথরুমে শিশু রামিসাকে ধর্ষণ করা হয়। মরদেহ লুকাতে শিশুটির মাথা কেটে ফেলা হয়। এছাড়াও শরীরের অন্য অংশগুলোও টুকরা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে এবং তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মিরপুর ১১ নম্বরের মিল্লাত ক্যাম্প সংলগ্ন বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
তিনি আরও বলেন, মরদেহ লুকানোর জন্যই সম্ভবত মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়। হাত কেটে টুকরা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শিশুটির মা দরজায় ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে মূল আসামি জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি তিনি।
গ্রেফতার সোহেল রানার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নাটোরে একটি মামলা আছে জানিয়ে এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, তার স্ত্রীর বক্তব্য থেকে যেটা আমরা পেয়েছি, তিনি সম্ভবত বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন একটা লোক। তিনি তার স্ত্রীকেও বিভিন্নভাবে টর্চার করেছেন। ধর্ষণের কারণে শিশুটির রক্তপাত শুরু হলে তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করার পরিকল্পনা করেন অভিযুক্ত ব্যক্তি বলে ধারণা পুলিশের।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন