
আর মাত্র দু’দন দিন। তারপরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসবে মেতে উঠবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরে। সেই উন্মাদনা থেকে পিছিয়ে নেই প্রবাসী বাংলাদেশিরাও।
নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, মিশিগান, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ভার্জিনিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়াসহ বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এখন বিশ্বকাপ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। চায়ের আড্ডা, রেস্তোরাঁ, কমিউনিটি সেন্টার, পারিবারিক আয়োজন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। কেউ টিকিট সংগ্রহ করছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার পরিকল্পনা করছেন, আবার কেউ অপেক্ষা করছেন জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ সরাসরি মাঠে বসে দেখার জন্য।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বসবাসরত বহু বাংলাদেশি ইতোমধ্যে বিভিন্ন ম্যাচের টিকিট সংগ্রহ করেছেন। বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন বাংলাদেশি সংগঠন বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজনও করছে। অনেকেই পরিবার নিয়ে স্টেডিয়ামে যাবেন। কেউ আবার কয়েকশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রিয় দলের খেলা দেখতে ছুটবেন অন্য অঙ্গরাজ্যে।
নিউইয়র্কপ্বাসী তরুন সরকারী চাকুরীজীবি মোফাচ্ছেল হক কাজল বলেন, ‘বিশ্বকাপ এলেই আমরা যেন আবার কিশোর হয়ে হয়ে যাই। কাজের ব্যস্ততা, জীবনের চাপ কিছুদিনের জন্য ভুলে যাই। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখা, প্রিয় দল নিয়ে তর্ক করা, যেন ফিরে পাই পুরোনো বাংলাদেশকে।’
একই শহরের বাসিন্দা রওনক বলেন, ‘আমেরিকায় অনেক বড় বড় ক্রীড়া আয়োজন হয়। কিন্তু বিশ্বকাপের আবেগ সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ একসঙ্গে উৎসব করে। সেই উৎসবের অংশ হতে পারাটা আমাদের জন্যও বিশেষ গর্বের।’
নিউইয়র্কে বসবাসরত তরুণ বাংলাদেশি সামি ইতোমধ্যে একটি ম্যাচের টিকিট সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে টেলিভিশনে বিশ্বকাপ দেখেছি। তখন কল্পনাও করিনি একদিন মাঠে বসে বিশ্বকাপ দেখব। এবার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। এখন দিন গুনছি।’
প্রবাসী বাংলাদেশিরা জানালেন বিশ্বকাপ এলেই তাদের মনে পড়ে দেশের ফুটবলের সোনালি দিনের কথা। আবাহনী-মোহামেডানের উত্তেজনাপূর্ণ দ্বৈরথ, চুন্নুর সৃজনশীলতা, আসলামের গোল, বাদল রায়ের মাঝমাঠের পারফরম্যান্স জীবন্ত হয়ে ওঠে স্মৃতির ভেতরে।
মিশিগানে বসবাসরত ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সময়ে আবাহনী-মোহামেডানের ম্যাচ মানেই ছিল উৎসব। স্টেডিয়ামে জায়গা পাওয়া যেত না। এখন বিশ্বকাপের খেলা দেখতে বসলে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে হয়, ফুটবল আমাদের জীবনেরই একটা অংশ।’
প্রবাসী জীবনে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছেও বিশ্বকাপের আবেদন কম নয়। অনেক শিশু-কিশোর বাংলা বলতে না পারলেও আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ফ্রান্স কিংবা জার্মানির খেলোয়াড়দের নাম অনর্গল বলতে পারে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নতুন প্রজন্মের মধ্যেও বিশ্বকাপের উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কিংবা বড় হওয়া অনেক শিশু-কিশোরের কাছে ফুটবল মানেই লিওনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। খেলার দিন প্রিয় তারকার জার্সি গায়ে চাপিয়ে তারা বসে পড়ে টেলিভিশনের সামনে। নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি কিংবা ডালাসের বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে এখন প্রায়ই দেখা যায়, ছোট্ট শিশুরা মেসি কিংবা রোনালদোর নাম বলতে বলতে আনন্দে লাফিয়ে উঠছে।
নিউ জার্সিপ্রবাসী শারমিন আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলে ফুটবল বলতে মেসিকে বোঝে। কিন্তু আমি তাকে বাংলাদেশের ফুটবলের গল্পও বলি। চুন্নু, আসলাম, বাদল রায়দের কথা বলি। ওরা যেন নিজেদের শিকড়টাও জানতে পারে।’
বিশ্বকাপকে ঘিরে ব্যবসায়িক ব্যস্ততাও বেড়েছে। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন, কুইন্স এবং নিউ জার্সির বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন দেশের জার্সি, পতাকা, স্কার্ফ ও স্মারকসামগ্রী। দোকানিরা বলছেন, বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসছে, ক্রেতার ভিড়ও তত বাড়ছে।
জ্যাকসন হাইটসের এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জানান, ‘সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি।’
বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠনও বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করছে। কোথাও বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন, কোথাও পরিবারভিত্তিক মিলনমেলা, আবার কোথাও শিশু-কিশোরদের জন্য ফুটবল প্রতিযোগিতা।
ম্যাচ শেষে স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে যখন হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে উল্লাসে মেতে উঠবেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা হয়তো তাদের মনে ভেসে উঠবে গ্রামের বাড়ির উঠোন, শহরের চায়ের দোকান, পাড়া-মহল্লার তর্ক, ছাদের ওপর উড়তে থাকা পতাকা আর রাতজাগা বিশ্বকাপের স্মৃতি।
বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে। আলো নিভে যাবে। গ্যালারি ফাঁকা হয়ে যাবে। কিন্তু থেকে যাবে কিছু ছবি, কিছু গল্প, কিছু উল্লাস আর কিছু অমূল্য স্মৃতি।