
বিশ্বকাপে বিতর্কিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে সমালোচনা তীব্র হওয়ার আগে তার ২০২৭ সালের পুনর্নির্বাচনে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ)।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফা নীরবে শীর্ষস্থানীয় সদস্য দেশগুলোর কাছে ২০২৭ সালের সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর প্রার্থিতার প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থন চেয়েছিল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এফএও এতে সম্মতি দিয়েছিল এবং বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর একটি সমর্থনপত্র পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে ট্রাম্প-ইনফান্তিনো সম্পর্ক ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যে সেই চিঠি পাঠানো হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি সংস্থাটি।
এফএ বর্তমানে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছে। কারণ, একদিকে সংস্থাটি প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর বিষয়ে কোনো অবস্থান জানায়নি, অন্যদিকে তাদের সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইন এবং যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টারের একাধিক রাজনীতিক ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেছেন।
তবে ইনফান্তিনোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পেছনে এফএর কৌশলগত কারণও রয়েছে। আগামী নভেম্বরে ইংল্যান্ডকে ২০৩১ নারী বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে নিশ্চিত করা হতে পারে। এছাড়া ভবিষ্যতে পুরুষদের বিশ্বকাপ আয়োজনের সম্ভাব্য বিডেও ইনফান্তিনোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গত ১০ বছর ধরে ফিফার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ইনফান্তিনো। ২০১৯ ও ২০২৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হন। ২০২৭ সালের নির্বাচনেও তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করা হচ্ছে।
ফিফার ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফুটবল উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়েছে। এর ফলে অধিকাংশ সদস্য দেশের ফুটবল সংস্থার আয়ও বেড়েছে, যা ইনফান্তিনোর জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে।
ফিফার মোট সদস্য দেশ ২১১টি এবং সভাপতি নির্বাচনে জয়ের জন্য প্রয়োজন ১০৬টি ভোট। গত এপ্রিলে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনমেবল তাদের ১০ সদস্য দেশের সমর্থন ঘোষণা করে। এরপর আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) তাদের ৫৪ সদস্য এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) তাদের ৪৭ সদস্য দেশের সর্বসম্মত সমর্থনের কথা জানায়।
অর্থাৎ এফএর সমর্থন ছাড়াই ইনফান্তিনোর পক্ষে অন্তত ১১১টি ভোট নিশ্চিত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা সম্প্রতি ফিফার একটি সিদ্ধান্তকে ‘সব সীমানা বা রেড লাইন পার করে গেছে।’ বলে উল্লেখ করে এবং সেটিকে ‘অভূতপূর্ব, দুর্বোধ্য ও অযৌক্তিক’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে ইনফান্তিনো ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে দাবি করেন, তার অনুরোধের পরই বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই ফিফার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
জার্মানি, বেলজিয়াম ও উয়েফা এ ঘটনায় প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে ইংল্যান্ডের জয়ের পর ইনফান্তিনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এফএ চেয়ার ডেবি হিউইটের কাছ থেকে নিজের নামে ‘ইনফান্তিনো ৯’ লেখা ইংল্যান্ডের জার্সি গ্রহণের একটি ছবি প্রকাশ করেন, যা দুই পক্ষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
এদিকে সাবেক লিভারপুল কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপও ঘটনাটির সমালোচনা করে বলেন, এটি আমাদের খেলা, তাদের নয়। যদি সত্যিই ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেদের মধ্যে বিষয়টি ঠিক করে থাকেন, তাহলে এটি পাগলামি; এতে পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ইনফান্তিনোর পদত্যাগের দাবিতে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির এমপি ক্লাইভ বেটস, লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভিসহ বেশ কয়েকজন রাজনীতিকও সরব হয়েছেন। এছাড়া সাবেক এফএ চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনও বালোগুন ইস্যুকে ‘সম্পূর্ণ ভুল এবং ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে এফএ এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো অবস্থান জানায়নি।
ফিফা জানিয়েছে, বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত তাদের শৃঙ্খলা বিধির ২৭ নাম্বার অনুচ্ছেদের আওতায় নেওয়া হয়েছে। অতীতেও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির ক্লাব ইন্টার মায়ামিকে ঘিরে প্রতিযোগিতার কিছু নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একই বিধান ব্যবহার করা হয়েছিল।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ইনফান্তিনো বলেছেন, ফিফার বিচারিক সংস্থাগুলো স্বাধীন এবং তারা আমার প্রভাবমুক্তভাবেই স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করে।