রাজসিক সৌন্দর্যে তেঁতুলিয়ার আকাশে শুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা

ভ্রমন ডেস্ক
  ২৫ নভেম্বর ২০২৫, ২৩:৩১

হেমন্তের সকালে আলতো শীতের মেঘ সরিয়ে মায়াবী কাঞ্চনজঙ্ঘা উদ্ভাসিত হয়েছে হিমালয়ের বিশালতায়। দীর্ঘ দিন পর মঙ্গলবার আবারও দেখা মিলেছে বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার রাজসিক সৌন্দর্য।
পঞ্চগড় জেলা শহরের প্রবহমান করতোয়া নদী বা মহানন্দা নদের উল্টোপাড়েই প্রতিবিম্ব ফেলে রঙিন আলোকছটায় মুগ্ধতা ছড়িয়ে প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে আহবান জানাচ্ছে ভালোবাসার।
রৌদ্রের কিরণে মাঝে-মধ্যেই রঙ বদলায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। কখনও লাল, কখনও কমলা আবার কখনও হয়ে উঠে কালো। তবে যে রঙেই থাকুক কাঞ্চনজঙ্ঘা নয়নাভিরাম হয়ে উঠে উত্তরের নীলাকাশে।
সুদীর্ঘকাল ধরে পঞ্চগড়ের মানুষ সকালে এক কাপ চায়ের উষ্ণতায় চুমুক দিতে দিতে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করে আসছেন। শরৎ, হেমন্ত আর শীতকালেই দেখা মেলে এই মহাশুভ্র নায়কের। কখনো কখনো বছরের অন্যান্য সময়েও দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার।
ভোর থেকে আস্তে আস্তে নিজেকে মেলে ধরে এই শৃঙ্গ। হিমালয়ের স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এক শক্তিমান প্রতিভূর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ লুকিয়ে পড়ে মেঘের আড়ালে। আকাশ আর স্থলের ক্যানভাসে যেন আঁকা ছবি। বাতাসে উড়তে উড়তে মেঘ সরে গেলে আবার জেগে ওঠে। আবার হারিয়ে যায়। মনে হয় কেউ যেন মুছে দেয় সেই ছবি। যেন লুকোচুরির খেলা। এই লুকোচুরির খেলায় দর্শকেরাও যোগ দেয়। আবার জেগে ওঠার অপেক্ষা করেন তারা।
তেঁতুলিয়া উপজেলার ডাকবাংলো এলাকা, মহানন্দা, ভেরসা, করতোয়া, ডাহুক নদীর পাড় এবং বিভিন্ন গ্রাম থেকে সবচেয়ে ভালো উপভোগ করা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা।
কাঞ্চনজঙ্ঘাকে বলা হয় সুপেয় পানির ঠিকানা। বরফের এই পাহাড় থেকে নেমে এসেছে চারটি নদী। এই নদীগুলো বয়ে গেছে পঞ্চগড়ের ওপর দিয়ে। হিমালয় আর কাঞ্চনজঙ্ঘার জলের ধারাও বয়ে যাচ্ছে এই সমতলের মাটির গভীর দিয়ে। এজন্য এই এলাকার পানি বাংলাদেশের সর্বোৎকৃষ্ট সুপেয়। এই পানিকে মিঠা পানিও বলা হয়।
হিমালয় পর্বতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। ১৮৫২ সালের আগে পৃথিবীতে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বলেই ধারণা করা হতো। বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া হিসেবে পৃথিবীতে স্থান করে নিয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। কাঞ্চনজঙ্ঘার  উচ্চতা ৮ হাজার মিটার বা ২৬ হাজার ফুট। এই পর্বত চুড়ার মোহনীয় সৌন্দর্য দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ভারত-নেপাল ভ্রমণ করেন। পঞ্চগড়ে খালি চোখেই দেখা যায় এই পর্বত শৃঙ্গের অপরূপ সৌন্দর্য।
কাঞ্চনজঙ্ঘার এ মনোমুগ্ধকর রূপ দেখতে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকরা।
স্থানীয়রা বলছেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলে সারা দেশের পর্যটকরা ছুটে আসেন তেঁতুলিয়ায়। তখন একটি উৎসবের মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কাঞ্চনজঙ্ঘা, শীতের আমেজ আর কুয়াশা এখন পুরো পঞ্চগড়কে আবেশময় করে তুলেছে। কিন্তু বছরজুড়ে তেঁতুলিয়ায় পর্যটকের ভিড় লেগে থাকলেও এখনো পর্যটনকেন্দ্রিক উন্নয়ন ঘটেনি । এজন্য প্রয়োজন সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ।
তেঁতুলিয়া থেকে ১৬৫ কিলোমিটার দূরত্বে বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর সূর্যোদয়ের সময় দিনের প্রথম সূর্যকিরণের ঝিকিমিকি পাসপোর্ট আর ভিসা ছাড়াই ভ্রমণপিপাসুরা প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে ইতোমধ্যে আসতে শুরু করেছেন তেঁতুলিয়ায়। ভোরে ঊষার সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর রোদ পড়ে সেই রোদ যেন ঠিকরে পড়ে পর্যটকের চোখে। হিমালয়ের সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘার নানান রূপ এখন দেখা যাচ্ছে।
একই অঙ্গে অনেক রূপ এই কাঞ্চনজঙ্ঘার। প্রথমে কালচে, এরপর ক্রমান্বয়ে টুকটুকে লাল, কমলা, হলুদ এবং সাদা রঙ ধারণ করে। দূরবিন বা বাইনোকুলারের প্রয়োজন নেই। দৃষ্টিশক্তি ভালো থাকলে তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে খালি চোখে হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘার নানান রূপ লাবণ্য দেখতে পাওয়া যাচ্ছে; যা প্রকৃতি প্রেমীদের আরও মুগ্ধ করে তুলছে। উত্তরের আকাশে নয়নাভিরাম হিমালয় মূলত বরফে ঢাকা সাদা মেঘের মতোই। সেই সঙ্গে রয়েছে পিরামিডের মতো কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, প্রতি বছর তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন  এলাকা থেকে খালি চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পর্যটকরা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য তেঁতুলিয়ায় এসে ভিড় জমান। পিকনিক কর্নারে এসে বেশির পর্যটক কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করেন। তাই উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পিকনিক কর্নারকে নতুন করে সাজানো হয়েছে। পর্যটকদের জন্য পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে।