শীর্ষ ঝুঁকির তালিকায় বাংলাদেশ

 বৈশ্বিক অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৭

অনলাইন স্ক্যাম এখন আর অজানা কিছু নয়। হাতে হাতে স্মার্টফোন। কল আসছে—কখনো আইআরএস থেকে, কখনো ইমিগ্রেশন অফিস থেকে, কখনো বলা হচ্ছে ফ্রি সোলার প্যানেল বসিয়ে দেবে, আবার কেউ বলছে বাড়ি নগদ অর্থে কিনে নেবে। হরেক রকম প্রলোভন, দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা। কিন্তু আপনি জানেন কি—এই ফোন স্ক্যাম কলগুলোর একটি বড় অংশ এখন আসছে বাংলাদেশ থেকেই?
বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে বসে বিশ্বজুড়ে অনলাইন প্রতারণা চালানো শক্তিশালী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে এবার নজিরবিহীন কঠোর অবস্থান নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নে বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ এবং আফ্রিকার কিছু অঞ্চল বর্তমানে অনলাইন স্ক্যাম কার্যক্রমের ক্ষেত্রে উচ্চঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সুযোগ নিয়ে—বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল টুল ব্যবহার করে—এই চক্রগুলো এখন আরও দ্রুত, জটিল ও সীমান্তছাড়া প্রতারণা চালাচ্ছে।
মার্কিন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে এই অভিযোগে যে, বাংলাদেশে বসে শুধু দেশীয় নাগরিকদের নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও প্রতারণার শিকার করা হচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে বসে মার্কিন পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনার একটি জালিয়াতি চক্র ধরা পড়ে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। একই সঙ্গে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশে সক্রিয় সাইবার অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও লক্ষ্যবস্তু করছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই অনলাইন প্রতারণাজনিত ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাপী এই ক্ষতির অঙ্ক ৬৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মার্কিন নাগরিক জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অনলাইন প্রতারণার মুখোমুখি হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অপরাধ এখন আর কোনো একক দেশ বা জনগোষ্ঠীতে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশে গড়ে ওঠা বৃহৎ স্ক্যাম সেন্টার থেকে বিশ্বজুড়ে মানুষকে লক্ষ্য করে অর্থ, তথ্য ও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব কেন্দ্রে শক্তিশালী মানব নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে প্রতারণামূলক কাজে যুক্ত বা আটকে রাখা হচ্ছে। মানব পাচারের মাধ্যমে লাওসের মতো দেশে নিয়ে আটকে রেখে সাইবার অপরাধে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘটনাও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে রয়েছে।
বাংলাদেশে ঢাকার বাইরে বসেই অনেক দক্ষ ও সংগঠিত জালিয়াত অনলাইনে মার্কিন নাগরিকদের টার্গেট করছে। ফোন স্ক্যামসহ প্রযুক্তিনির্ভর নানা ধরনের প্রতারণা প্রতিদিনই ঘটছে। সংবাদ হচ্ছে, মানুষ প্রতারিত হচ্ছে—কিন্তু কার্যকর প্রতিকার খুব কমই দেখা যাচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রতারণা থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ মাদক পাচার, অস্ত্র ব্যবসা ও মানব পাচারের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, অন্তত এক লাখেরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে জড়িত বা প্রভাবিত, এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে অনলাইন প্রতারণা ও আন্তর্জাতিক স্ক্যাম চক্র দমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে নিবন্ধিত এইচ.আর. ৫৪৯০ নম্বরের বিলটি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর বিবেচনায় রয়েছে। দলমত নির্বিশেষে বিলটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং এটি ব্যাপক সমর্থনে পাস হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের লক্ষ্য হলো বিদেশে অবস্থানকারী সংগঠিত প্রতারণা চক্রগুলোকে চিহ্নিত করা, তাদের অর্থনৈতিক শিকড় ভেঙে দেওয়া এবং অনলাইন প্রতারণা বন্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। আইনটি কার্যকর হলে পররাষ্ট্র, বিচার, অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগ–সংক্রান্ত সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত আন্তঃসংস্থাগত টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। এই কাঠামোর আওতায় বিদেশি সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত, অর্থের উৎস ট্র্যাক, নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে—তবে সরাসরি একতরফা সামরিক বা আইনশৃঙ্খলা অভিযান চালানোর বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।
আইনটিতে মানব পাচারের শিকার হয়ে প্রতারণা কেন্দ্রে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার ও সহায়তার ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিলটি কমিটিতে পর্যালোচনা শেষে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন কার্যকর হলে শুধু আর্থিক ক্ষতি কমানোই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ সিন্ডিকেটগুলোর শক্তিও দুর্বল করা সম্ভব হবে। অনলাইন প্রতারণা এখন ব্যক্তি, পরিবার ও রাষ্ট্র—তিন স্তরেই একটি বড় নিরাপত্তা হুমকি। বাংলাদেশসহ যেসব দেশ ঝুঁকির তালিকায় উঠে এসেছে, সেখানে সমন্বিত আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া এই অন্ধকার জাল ছিন্ন করা কঠিন—এই সতর্কবার্তাই এখন সবচেয়ে জোরালো।