নিউজার্সির ন্যুয়ার্ক আইস বন্দিশালায় অনশন ও কর্মবিরতি, বিক্ষোভকারীদের সড়ক অবরোধ

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৬ মে ২০২৬, ২০:৩৭

নিউজার্সির ন্যুয়ার্কে অবস্থিত আইস ডেলেনি হল অভিবাসী বন্দিশালায় আটক বন্দিদের অনশন ও কর্মবিরতি তৃতীয় দিনেও রোববার পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। বন্দিদের অভিযোগ—অমানবিক পরিবেশ, দুর্বল চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য করা হচ্ছে তাদের। এসবের প্রতিবাদে শুক্রবার শুরু হওয়া ধর্মঘট এখন রীতিমতো বড় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
রোববার সন্ধ্যায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যখন ধর্মঘটের অন্যতম নেতা মার্টিন সোটোকে হঠাৎ অন্যত্র স্থানান্তরের চেষ্টা করে কর্তৃপক্ষ। খবরটি বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবার ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তেই তারা ডেলেনি হলের মূল প্রবেশপথ ঘিরে কয়েক ঘণ্টার অবরোধ গড়ে তোলে। “মার্টিনকে মুক্ত করো, সবাইকে মুক্ত করো”—এই স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ মার্টিন সোটোর ২৮ বছর বয়সী স্ত্রী গ্যাব্রিয়েলা সোটো। তিনি নিজে একজন মার্কিন নাগরিক এবং বর্তমানে কয়েক মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীর মুক্তির দাবিতে গত কয়েকদিন ধরেই বন্দিশালার বাইরে প্রতিদিন অবস্থান করছেন তিনি।
রোববার বিকেলে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন গ্যাব্রিয়েলা। হঠাৎ তিনি দেখতে পান একজন বন্দিকে দ্রুত একটি ভ্যানে তোলা হচ্ছে। পাশে থাকা অন্য দর্শনার্থীরা জানান—সেই ব্যক্তি তাঁর স্বামী মার্টিন। খবরটি শুনেই গর্ভবতী গ্যাব্রিয়েলা ছুটে যান ভ্যানের দিকে।
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমি ভ্যানের দরজায় ঘুষি মারছিলাম। আমি এটা হতে দিতে পারি না। তারা আমার স্বামীকে চুপিসারে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল।”
এর আগে মার্টিন সোটোর আইনজীবীরা নিউজার্সির আদালতে হেবিয়াস কর্পাস আবেদন করে তাঁকে অন্য রাজ্যে স্থানান্তর ঠেকানোর অনুরোধ জানান। ফেডারেল বিচারকও নিউজার্সির বাইরে স্থানান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন। তবে একই রাজ্যের অন্য বন্দিশালায় স্থানান্তরে আইনি বাধা না থাকায় সোমবার ভোরে তাঁকে নিউজার্সির এলিজাবেথ কন্ট্র্যাক্ট ডিটেনশন ফ্যাসিলিটিতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি।
গ্যাব্রিয়েলার অভিযোগ, শুক্রবার থেকে রক্ষীরা তাঁর স্বামীকে আলাদা একটি সেলে আট ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—“আপনাকে এখনই ছেড়ে দিলে আপনি কি আপনার স্ত্রীকে প্রতিবাদ বন্ধ করতে বলবেন? আপনি কি জানতেন আপনার স্ত্রী আন্দোলন করছেন?” মার্টিনের উত্তর ছিল—“নো কমেন্ট।”
গ্যাব্রিয়েলা জানান, কয়েক মাস আগে নিউ জার্সির কার্নিতে তাঁদের ছোট সন্তানের জন্য ডায়াপার কিনতে বের হলে আইসিই মার্টিনকে গ্রেফতার করে। পেরু থেকে আসা এই দম্পতি একসঙ্গে দশ বছর ধরে সংসার করছেন।
রোববার রাতের বিক্ষোভে যোগ দেন আরও বহু অভিবাসী পরিবারের সদস্য। তাঁদের মধ্যে ছিলেন এরিকা নামের এক মা, যার ১৮ বছর বয়সী মেয়েকে এলিজাবেথের একটি আইসিই বন্দিশালায় বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আটক করা হয়। এরপর তাকে আর বের হতে দেওয়া হয়নি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে এরিকা বলেন, “এক মাস তেইশ দিন ধরে অন্যায়ভাবে আমার মেয়ে বন্দি। সে এখনও হাই স্কুলের ছাত্রী। শুক্রবার তার প্রম ছিল—কিন্তু সে সেখানে যেতে পারেনি। একজন অপরাধীর মতো তাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে।”
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ডেলেনি হলের ভেতর থেকেও প্রতিবাদের দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লোহার গরাদের আড়াল থেকে বন্দিদের হাত দিয়ে জোরে জোরে গরাদে আঘাত করার শব্দ বাইরে পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল। বাইরে থাকা স্বজনদের চোখে তখন ছিল আতঙ্ক, ক্ষোভ আর অশ্রু।
উল্লেখ্য, ডেলেনি হল মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় আগে চালু হয়েছে এবং এটি নিউইয়র্ক মহানগর এলাকার সবচেয়ে বড় অভিবাসী বন্দিশালা। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০০ বন্দি স্বাক্ষর করে একটি চিঠিতে অভিযোগ করেছেন—এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল, পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা হচ্ছে না।
সোমবার ভোরে আইস জানায়, প্রায় ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে গেট এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডেলেনি হল পরিচালনা করছে জিইও গ্রুপ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
ডেলেনি হলের এই আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি, বন্দি অধিকার এবং মানবিক আচরণ নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।