মেয়র মামদানিকে সরানোর ইঙ্গিত হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মুলিনের

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৭ জুন ২০২৬, ১৪:০২


নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়াইনে মুলিন এবার প্রকাশ্যেই নিউইয়র্কবাসীকে “বোধোদয় হওয়ার” আহ্বান জানিয়ে ভবিষ্যতে মামদানিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
গত ১১ জুন বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং তথাকথিত “স্যাঙ্কচুয়ারি সিটি” নীতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মুলিন মেয়র মামদানির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি মামদানিকে “র‍্যাডিক্যাল সোশ্যালিস্ট”, “পুলিশবিরোধী” এবং “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টিকারী” নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। 
মুলিন বলেন, “নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ দেশের সেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর একটি। তারা অত্যন্ত দক্ষ, পেশাদার এবং দায়িত্বশীল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের এমন একজন নেতা রয়েছে, যিনি তাদের হাত-পা বেঁধে রেখেছেন।” তিনি আরও বলেন, “এনওয়াইপিডির সদস্যরা শুধু তাদের কাজ করতে চান। তারা জনগণের সেবা করতে চান। কিন্তু তাদের এমন একজন নেতা রয়েছে, যিনি তাদের কার্যক্রম সীমিত করে দিচ্ছেন। আশা করি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে নিউইয়র্কবাসীর বোধোদয় হবে এবং একজন প্রকৃত নেতাকে বেছে নেবে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুলিনের এই মন্তব্য শুধু প্রশাসনিক সমালোচনা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতিরও একটি ইঙ্গিত। কারণ তিনি সরাসরি নিউইয়র্কবাসীর উদ্দেশে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন। মুলিন একই সঙ্গে মেয়র মামদানির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। গত বছরের শেষদিকে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্প ও মামদানির বহুল আলোচিত বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন।
মুলিনের ভাষায়, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে ওভাল অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। রাজনৈতিক মতবিরোধ ভুলে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বৈঠকের পর মামদানির আচরণ তার চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।”
তবে মেয়র মামদানি বরাবরই ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কঠোর সমালোচক। বৈঠকের কয়েকদিন পর এক সাক্ষাৎকারে তিনি পুনরায় ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নিউইয়র্কবাসীর জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং নগর সমস্যার সমাধানে উভয় পক্ষের মধ্যে কিছু বিষয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
অভিবাসন নীতি নিয়েও দুই পক্ষের বিরোধ স্পষ্ট। মামদানি দীর্ঘদিন ধরে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর কার্যক্রমের সমালোচনা করে আসছেন এবং সংস্থাটি বিলুপ্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন রোধে আইস-এর ক্ষমতা ও কার্যক্রম আরও জোরদার করার পক্ষে।
কয়েকদিন আগেও মুলিন অভিযোগ করেছিলেন যে মামদানির অভিবাসন নীতি নিউইয়র্ককে দুর্বল করছে এবং শহরের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তার দাবি, মেয়রের বর্তমান নীতিগুলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরীর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অন্যদিকে মামদানির সমর্থকরা বলছেন, মেয়র অভিবাসী সম্প্রদায়, শ্রমজীবী মানুষ এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন। তারা মনে করেন, ফেডারেল প্রশাসনের সঙ্গে তার সংঘাত মূলত মানবিক অভিবাসন নীতি, নাগরিক অধিকার এবং স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে।
নিউইয়র্কের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুলিন ও মামদানির সাম্প্রতিক বাক্যুদ্ধ কেবল ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়; বরং এটি ফেডারেল সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং নিউইয়র্ক সিটির প্রগতিশীল প্রশাসনের মধ্যে চলমান বৃহত্তর আদর্শিক সংঘাতের প্রতিফলন।
আগামী মাসগুলোতে অভিবাসন, পুলিশি কার্যক্রম, নগর নিরাপত্তা এবং ফেডারেল-স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার প্রশ্নে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি, যিনি একদিকে প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতীক, অন্যদিকে রক্ষণশীল মহলের অন্যতম প্রধান সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছেন।