শ্বেতাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগে দক্ষিণ আফ্রিকায় ভিসা সীমিত করল যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক রিপোর্ট
  ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৪০

দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার সর্বশেষ ঘটনা হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সমালোচনা করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিগত বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে নেওয়া এমন কিছু নীতি, যা মূলত ডাচ ও ফরাসি বসতি স্থাপনকারীদের বংশধর আফ্রিকানারদের প্রতি বৈষম্যমূলক বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি। দক্ষিণ আফ্রিকা বারবারই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
মঙ্গলবার এই নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার আগে উত্থাপিত উদ্বেগগুলোর যথাযথ কোনো সুরাহা করেনি।
তিনি জানান, এই ভিসা নিষেধাজ্ঞা তাদের ওপরই কার্যকর হবে, যারা দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘জাতি-ভিত্তিক বৈষম্যকে উসকে দেয়, সহিংসতা ছড়ায় কিংবা ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমি বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।’ তবে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় কারা পড়ছেন, রুবিও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কারও নাম প্রকাশ করেননি।
গত বছরের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। এ সময় মার্কিন নেতা সহায়তা কমিয়ে দেন, দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেন এবং ‘নিপীড়ন’ থেকে পালিয়ে আসা শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের ‘আশ্রয়’ দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
তবে শ্বেতাঙ্গদের ওপর নিপীড়ন চালানো বা তাদের জমি বাজেয়াপ্ত করার অভিযোগ দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকার জানিয়েছে, শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে গণহত্যার দাবিগুলো ব্যাপকভাবে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে এবং এগুলোর সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার সাম্প্রতিক অপরাধ বিষয়ক পরিসংখ্যান থেকেও এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না যে অন্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় শ্বেতাঙ্গরা সহিংস অপরাধের শিকার বেশি হচ্ছে।
গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এমন একটি আইনে স্বাক্ষর করেন, যার আওতায় সরকার বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ ছাড়াই জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে। এরপরই ট্রাম্প আফ্রিকানারদের (শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান) শরণার্থী মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
এই আইনের অধীনে জনস্বার্থে রাষ্ট্র সম্পত্তি অধিগ্রহণ করতে পারে এবং এমন পরিস্থিতির বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ শূন্য নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্তৃপক্ষকে প্রথমে সম্পত্তির মালিকদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হয় এবং কোনো বিরোধ দেখা দিলে তা আদালতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
বর্ণবাদ প্রথার অবসানের তিন দশকেরও বেশি সময় পরেও দক্ষিণ আফ্রিকায় জমির মালিকানা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। বর্ণবাদী শাসনামলে কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল এবং তাদের অনেক মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
সরকার বলছে, ঐতিহাসিক বৈষম্য নিরসনে ভূমি সংস্কার জরুরি। নতুন আইনে খেয়ালখুশিমতো জমি বাজেয়াপ্ত করার কোনো সুযোগ নেই। অধিকাংশ ব্যক্তিগত কৃষিজমির মালিক শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানরা, যারা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৭ শতাংশেরও সামান্য বেশি।
মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক পৃথক পোস্টে রুবিও দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের বিরুদ্ধে ‘আফ্রিকানার সংখ্যালঘুদের প্রতি জাতিগত বিদ্বেষ’ পোষণের অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন,  যেসব ‘অবিচার’ চলছে, তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ‘যুক্তরাষ্ট্রে কোনো স্থান নেই’।
তিনি বলেন, আফ্রিকানার ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘সরকারি মদতপুষ্ট বৈষম্য’ নিয়ে ওয়াশিংটন যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা নিরসনে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের আচরণকে অবাধে চলতে দেবে না।’
রুবিও উল্লেখ করেন, এই নীতির আওতায় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা ‘শান্তি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনকে’ ক্ষুণ্ণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিধিনিষেধের বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকার এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। প্রিটোরিয়ায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন মনে করে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে আলোচনার পথ এখন রুদ্ধ হয়ে গেছে। দূতাবাস দেশটির বিরুদ্ধে শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি প্রদর্শনে ব্যর্থতার অভিযোগও এনেছে।
তারা সতর্ক করে বলেছে, নতুন ভিসা বিধিনিষেধগুলো আরও কঠোর পদক্ষেপের সূচনা মাত্র। দূতাবাস বলেছে, ‘ভিসা বিধিনিষেধের এই নীতিটি কঠোরতর পদক্ষেপের একটি ধারার প্রথম ধাপ মাত্র, যা এ বিষয়ে আমেরিকার দৃঢ় সংকল্প তুলে ধরবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে দক্ষিণ আফ্রিকা নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট রামাফোসা একটি বড় প্রতিনিধিদল নিয়ে হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন। সেই দলে তাঁর জোট সরকারের শ্বেতাঙ্গ সদস্য এবং বিখ্যাত শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান গলফাররাও ছিলেন।
কিন্তু ওভাল অফিসের সেই বৈঠকে ট্রাম্প হঠাৎ করেই দাবি তোলেন যে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান কৃষকদের হত্যা ও ‘নিপীড়ন’ করা হচ্ছে। তিনি এমন সব প্রমাণ হাজির করেন, যা ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার পরবর্তী সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। এর জেরে আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকৃত পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, যা সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই ভিসা বিধিনিষেধগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের একটি ধারার অধীনে আরোপ করা হচ্ছে। এই ধারায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এমন বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাদের প্রবেশ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হতে পারে।