
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার আবহেই পর্দা উঠেছে ৫১তম টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (টিফ)-এর। উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ এই চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমা প্রদর্শিত হলেও কানাডার দক্ষিণের প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্র থেকেই প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক দর্শক ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অংশ নেন।
এবারের টিফ শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে লেক অন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
উৎসবের উদ্বোধনী রাত থেকেই এ বিষয়টি নিয়ে আয়োজকদের বক্তব্যে ছিল হতাশা, ব্যঙ্গ ও প্রতিবাদের সুর। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধী অধিকারভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘বিইং হিউম্যান’ পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে টিফ-এর প্রধান নির্বাহী ক্যামেরন বেইলি বলেন, ‘টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং সুন্দর লেক অন্টারিওর তীরে সবাইকে স্বাগত।’
টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাও-ও নিজের বক্তব্যে বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ যখন একসঙ্গে থাকে এবং নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকে, তখন তারা পাহাড়ও সরিয়ে দিতে পারে—এমনকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শক্তির বিরুদ্ধেও।’
এর আগে ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিরোধে জড়িয়েছেন। গত আগস্টে তিনি কানাডাকে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘অন্যায্য আচরণ’ করার অভিযোগ করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে কানাডাও সমপরিমাণ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে।
লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের জন্য গুগল ও অ্যাপলের ম্যাপেও ‘লেক আমেরিকা’ নামটি দেখা যায়। তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ কিছু সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তারা ঐতিহাসিক লেক অন্টারিও নামটিই ব্যবহার করবে।
টিফ-এর মঞ্চেও বিষয়টি উঠে এসেছে। পরিচালক পিটার ফ্যারেলি তাঁর সিলভেস্টার স্ট্যালোন অভিনীত ‘আই প্লে রকি’ সিনেমার প্রিমিয়ারে বলেন, ‘লেক অন্টারিওর তীরে ফিরে এসে আমি কতটা আনন্দিত, তা বলে বোঝাতে পারব না।’
এদিকে টিফ-এর বিশ্ব প্রিমিয়ার পাওয়া কানাডীয় সিনেমা ‘দ্য স্টান্ট ড্রাইভার’-ও যেন বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে মিলে গেছে। মাইকেল ডাউস পরিচালিত ও জে বারুশেল অভিনীত সিনেমাটি ১৯৭০-এর দশকের কানাডীয় স্টান্টম্যান কেন কার্টারের গল্প। তাঁর স্বপ্ন ছিল রকেটচালিত একটি লিংকন কন্টিনেন্টাল গাড়ি সেন্ট লরেন্স নদীর ওপর দিয়ে লাফিয়ে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে দেওয়া।
সিনেমাটিতে কানাডীয় পরিচয় নিয়ে বেশ কিছু দৃশ্য দর্শকদের উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া পায়। একটি দৃশ্যে বারুশেলের চরিত্র কানাডীয়দের ‘ঈশ্বরের নির্বাচিত মানুষ’ বলে উল্লেখ করে। আরেক দৃশ্যে আমেরিকান স্টান্টম্যান এভেল নিভেলকে উদ্দেশ করে সে বলে, কানাডীয়দের কীভাবে কাজ করতে হবে, তা কোনো ‘ইয়াঙ্কি’ এসে শেখানোর প্রয়োজন নেই।
টিফ-এর দর্শকরা এসব দৃশ্যে জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। পরিচালক ডাউস স্বীকার করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সিনেমার কিছু মুহূর্ত এখন বাস্তবতার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে।
তবে বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে তাঁর অবস্থান ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত। ডাউস বলেন, ‘আমি আমেরিকানদের ভালোবাসি। এই পুরো বাণিজ্যযুদ্ধকে আমার কাছে অতিরঞ্জিত দম্ভের মতো মনে হচ্ছে। আশা করি তারা একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে। কারণ আমরা শত্রুর চেয়ে ভালো বন্ধু।’