যুক্তরাষ্ট্রে ৬.৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগে চিকিৎসকসহ ৪৫৫ জনকে অভিযুক্ত 

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৪ জুন ২০২৬, ১২:৫৯
আপডেট  : ২৪ জুন ২০২৬, ১৭:৩৮

মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড কর্মসূুচি থেকে চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও ভুয়া রোগী দেখিয়ে অন্তত ৬.৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ৪৫৫ জনকে অভিযুক্ত করেছে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্তদের মধ্যে ৯০ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী রয়েছেন। অভিযুক্তরা নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ ও করদাতাদের অর্থ আত্মসাত করে ব্যায় করেছেন নিজেদের বিলাসবহুল ফেরারী, রোলস রয়েলস গাড়ি, হীরার গয়না, প্রাসাদ, শিল্পকর্ম, ব্যক্তিগত ইয়ট ও বিদেশি রিসোর্ট কেনার পেছনে। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এর তদন্তে উঠে এসেছে এমন তথ্য।
ডিওজে’র মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির বিরুদ্ধে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সবচেয়ে বড় যৌথ অভিযান বলে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫টি অঙ্গরাজ্য ও বিভিন্ন শহরে পরিচালিত এই অভিযানে মোট ৪৫৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অর্থ আত্মসাৎ করে বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছেন বলে অভিযোগ।
নিউইয়র্ক পোস্ট জানায়, সবচেয়ে আলোচিত মামলাগুলোর একটিতে টেক্সাসের নার্স মারিজেল ইউকি প্রায় ৯০৬ মিলিয়ন ডলারের ভুয়া মেডিকেয়ার দাবি জমা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি অপ্রয়োজনীয় টিস্যু গ্রাফট ব্যবহার করে রোগীপ্রতি প্রায় ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত বিল করতেন। এই স্কিম থেকে তিনি প্রায় ২৯৭ মিলিয়ন ডলার পেয়েছেন বলে অভিযোগ।
তদন্ত অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা অর্থ দিয়ে তিনি ফিলিপাইনে ৪.৬ মিলিয়ন ডলারের একটি সমুদ্রসৈকত রিসোর্ট নির্মাণ করেন। এছাড়া কেনেন ৫৯৪ হাজার ডলারের একটি ফেরারি ২৯৬ জিটিএস, ৮৬৫ হাজার ডলারের কাস্টম বুলগারি ডায়মন্ড নেকলেস এবং একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি ও গয়না। গ্রেপ্তারের সময় তার ব্যাংক হিসাব থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার এবং নগদ ৪৬৭ হাজার ডলার জব্দ করা হয়।
আরেক মামলায় বায়োইঞ্জিনিয়ারড স্কিন গ্রাফট বিক্রিকারী একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রায়ান রোয়ানের বিরুদ্ধে চিকিৎসকদের অবৈধ কমিশন দিয়ে পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের দাবি, তিনি ২৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে বহু মিলিয়ন ডলারের বাড়ি, জীবনবিমা এবং বিলাসবহুল গাড়ি কিনেছিলেন।
তদন্তকারীরা জানান, এই চক্র মূলত হসপিস রোগীদের লক্ষ্যবস্তু বানাতো। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই রোগীদের শরীরে স্কিন গ্রাফট প্রয়োগ করা হতো, এমনকি এমন ক্ষতেও ব্যবহার করা হতো যেখানে এসব চিকিৎসার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই চক্র মোট ১.২ বিলিয়ন ডলারের দাবি জমা দিয়ে ৬১৪ মিলিয়ন ডলার আদায় করেছে বলে অভিযোগ।
ইলিনয়ের ড্যানিয়েল রবিনসনের বিরুদ্ধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৯২ মিলিয়ন ডলারের ভুয়া বিল জমা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তার প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন শত শত ঘণ্টার কাউন্সেলিং ও থেরাপি সেবা দেওয়ার দাবি করত, যা বাস্তবে সম্ভব ছিল না।
কর্তৃপক্ষ জানায়, রবিনসন প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিলেন এবং সেই অর্থের একটি বড় অংশ বিনিয়োগ, রিয়েল এস্টেট ও একটি বিলাসবহুল গাড়ির শোরুম স্থাপনে ব্যয় করেন। তার মালিকানাধীন একটি ইয়টের নাম ছিল “বাট নেকিড”, যা শিকাগোতে নোঙর করা ছিল।
অন্যদিকে টেক্সাসের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জেসন ফিঙ্কেলস্টাইনের বিরুদ্ধে ৮৯ মিলিয়ন ডলারের চিকিৎসা জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, তিনি শিক্ষার্থী ক্রীড়াবিদদের হৃদযন্ত্র পরীক্ষা করে ভুয়া রোগ নির্ণয় করতেন এবং পরীক্ষার ফল মাত্র কয়েক সেকেন্ড দেখে অনুমোদন দিতেন।
একটি ঘটনায় ২০২৪ সালে এক ছাত্র ক্রীড়াবিদের পরীক্ষার রিপোর্টে সম্ভাব্য হৃদরোগের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তিনি সেটিকে “স্বাভাবিক” বলে অনুমোদন দেন। মাত্র ২৪ দিন পর ওই শিক্ষার্থী বাস্কেটবল অনুশীলনের সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ফ্লোরিডার ব্যবসায়ী ইব্রাহিম খালদুন হিলমির বিরুদ্ধে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলারের ভুয়া মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড বিল জমা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তার দুটি কোম্পানি এমন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ক্ষত পরিচর্যার সামগ্রীর বিল করত যা কখনোই রোগীদের সরবরাহ করা হয়নি বলে অভিযোগ।
প্রসিকিউটরদের দাবি, তিনি অন্তত ৫.৭ মিলিয়ন ডলার পেয়েছিলেন এবং পরে সেই অর্থ হংকং ও ইন্দোনেশিয়ায় স্থানান্তর করেন। জালিয়াতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি বিদেশে পালিয়ে যান। পরে সাইপ্রাসে গ্রেপ্তার হয়ে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হয়।
ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস জানিয়েছে, এই অভিযান স্বাস্থ্যসেবা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ব্যাপক দুর্নীতি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকারের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপগুলোর একটি। কর্তৃপক্ষের মতে, এসব অর্থ মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রবীণ নাগরিক এবং চিকিৎসা সহায়তার প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ ছিল, যা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।