নির্বাচনের পর দেশে আ.লীগের কার্যালয় খোলার হিড়িক, নেপথ্যে কী?

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:২১
আপডেট  : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:২১


নির্বাচনের পর থেকে দেশে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের প্রবেশ ও কার্যক্রম শুরু করার সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে।  ঢাকা, চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, জামালপুর ও রাজবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। তবে কিছু কার্যালয় খোলা হলেও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, যেমনটা দেখা গেছে ময়মনসিংহের তারাকান্দা ও ধানমন্ডি এলাকায়।
এই প্রবেশ ও কার্যক্রমের পেছনের কারণ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে প্রশ্ন হচ্ছে- এটি কি দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় হচ্ছে, নাকি নেতাকর্মীদের নিজস্ব উদ্যোগ? 
দ্বিতীয়ত এটিতে বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে কোনো সমঝোতা রয়েছে কি না?
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে দলের কার্যক্রমে বাধা থাকলেও নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিল ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে এসেছে। 
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রজ্ঞাপনের শেষ দিকে উল্লেখ করা হয়, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন কর্তৃক যেকোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো’।
কার্যালয় খোলা কিংবা দলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্মগোপনে থাকা দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, দলীয় কার্যালয় কোনোভাবে নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত হয়নি। তাই নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সেখানে যাওয়ায় কোনো বাধা নেই। কর্মী-সমর্থকরা দলীয় কার্যালয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড উন্মুক্ত হবে—এই আশা নিয়েই তারা যাচ্ছে।
বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দেখা গেছে, নির্বাচনের আগে বিএনপি বা জামায়াতের স্থানীয় নেতারা নিজেরাই আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আশ্বাস দিয়েছেন যে নির্বাচনের পর কার্যালয় খোলার ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না। তবে কিছু জায়গায় এই আশ্বাস ব্যর্থও হয়েছে, ফলে ভাঙচুর বা পালটা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পঞ্চগড়ের কার্যালয় খোলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে স্থানীয় বিএনপি নেতার উপস্থিতিতে তালা খোলা হয়।
নেতাকর্মীদের মতে, শেখ হাসিনা নিজে নিয়মিত বিভিন্ন অ্যাপ ও যোগাযোগ মাধ্যমে তৃণমূল নেতাদের দলীয় কার্যালয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর নিজ জেলায় অবস্থান করতে পারেননি রিহান সরদার নামে ছাত্রলীগের একজন কর্মী। এরপর ঢাকায় অবস্থান নিয়ে ঝটিকা মিছিলসহ নিজেদের উদ্যোগেই নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আসছেন বলে জানান তিনি। সম্প্রতি ঢাকা বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার কর্মসূচি দিয়ে সেখানে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন। এটি কর্মীদের কিছুটা সাহস যুগিয়েছে বলে মনে করেন রিহান সরদার।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা বা স্বাভাবিক কার্যক্রমের সুযোগ প্রদান ইতিবাচক হবে। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম আবার শুরুর একটি প্রক্রিয়ার হয়তো সূচনা হয়েছে কার্যালয় খোলার তৎপরতার মাধ্যমে। গত সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি। কিন্তু তার মানে এই না যে দলটি সবসময় নিষিদ্ধ থাকবে। আবার আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তী সরকারকে গ্রহণ করেনি, কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে তারা প্রত্যাখ্যানও করেনি। তাছাড়া বিভিন্ন দলকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়ার উদাহরণ বিএনপির আগেও আছে। 
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, নির্বাচনের পর যেসব জায়গায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার তথ্য এসেছে সেখানে অনেক জায়গাতেই স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে। আমার মনে হয় নির্বাচিত সরকার এসেছে এবং এখন তাদের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্ব পাবে। আওয়ামী লীগকে ছাড়া বিগত সরকার নির্বাচন করে গেছে। দলটির কর্মী-সমর্থকরা দেশে আছে এবং অনেকে কারাগারে।
প্রসঙ্গত, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

  সূত্র: বিবিসি বাংলা।