
মার্কিন প্রেসিডেন্ট—শুনলেই মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ। হোয়াইট হাউসে থাকা, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়া, আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা—সব মিলিয়ে তাঁদের ক্ষমতার পরিধি বিশাল। কিন্তু এই বিপুল ক্ষমতার আড়ালেই আছে কঠোর কিছু বিধিনিষেধ। এমন অনেক সাধারণ কাজ আছে, যেসব সাধারণ মানুষ অনায়াসে করে, অথচ দায়িত্বে থাকা অবস্থায় একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সেসব পুরোপুরি নিষিদ্ধ বা প্রায় অসম্ভব। নিরাপত্তা, আইন, ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক নিয়ম—সব মিলিয়েই এসব বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে। চলুন দেখে নেওয়া যাক, মার্কিন মুলুকের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে যেসব কাজ করা একপ্রকার নিষিদ্ধ।
১. নিজে গাড়ি চালানো
যুক্তরাষ্ট্রে নিজের গাড়ি নিজে চালানো একজন সাধারণ মার্কিনের নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু দায়িত্বে থাকা অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট রাস্তায় নিজে গাড়ি চালাতে পারেন না। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের সব ধরনের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে সিক্রেট সার্ভিস।
রাস্তায় সর্বশেষ নিজে গাড়ি চালিয়েছিলেন দেশটির ৩৬তম (১৯৬৩–১৯৬৫) প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন। এর পর থেকে এই নিয়ম কঠোরভাবে মানা হচ্ছে।
তবে ব্যতিক্রম আছে। ক্যাম্প ডেভিড বা ব্যক্তিগত খামারবাড়ির মতো নিরাপদ এলাকায় প্রেসিডেন্ট কখনো হাঁটতে পারেন, সাইকেল চালাতে পারেন বা সীমিত পরিসরে গাড়িও চালাতে পারেন। যেমন জর্জ ডব্লিউ বুশ তাঁর খামারে গাড়ি হাঁকাতে বেশ উপভোগ করতেন।
২. সাধারণ স্মার্টফোন বা গ্যাজেট ব্যবহার
সাইবার নিরাপত্তার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সাধারণ বাজারচলতি ফোন, ট্যাবলেট বা স্মার্ট ওয়াচ ব্যবহার করতে পারেন না।
বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নিজের ব্ল্যাকবেরি ফোনটি ছাড়তে চাননি। পরে বিশেষভাবে সুরক্ষিত একটি সংস্করণ ব্যবহারের অনুমতি পান, যেটির নামও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে—‘ওবামাপ্যাড’।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরাপত্তার কারণে একাধিক ‘বার্নার ফোন’ ব্যবহার করেছেন। আর জো বাইডেন ব্যবহার করতেন বিশেষভাবে পরিবর্তিত অ্যাপল ওয়াচ ও পেলোটন বাইক।
৩. সন্তানের স্কুল অনুষ্ঠান বা খেলায় অংশ নেওয়া
মা–বাবার কাছে সন্তানের নাচের অনুষ্ঠান বা খেলায় উপস্থিত থাকা খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পরিবারের জন্য এটি প্রায় অসম্ভবছবি: পেক্সেলস
মা–বাবার কাছে সন্তানের নাচের অনুষ্ঠান বা খেলায় উপস্থিত থাকা খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পরিবারের জন্য এটি প্রায় অসম্ভব।
কারণ, প্রেসিডেন্ট কোথাও গেলে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে হয়, যা অন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সন্তানদের অনেক সময় হোয়াইট হাউসেই স্কুলের ব্যবস্থা করা হয়, শ্রেণিকক্ষ ও খেলার মাঠসহ।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে ব্লক করা
সাধারণ ব্যবহারকারীরা চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কাউকে ব্লক করতে পারেন; কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা পারেন না।
সাধারণ ব্যবহারকারীরা চাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে কাউকে ব্লক করতে পারেন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা পারেন না।
২০১৮ সালে একটি ফেডারেল আদালত রায় দেন, প্রেসিডেন্ট কাউকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লক করতে পারবেন না। কারণ, এতে নাগরিকের মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়।
এ কারণে প্রেসিডেন্টের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টও থাকে কঠোর নজরদারির মধ্যে।
কারণ, বাণিজ্যিক ফ্লাইট নিরাপত্তার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত। তাই প্রেসিডেন্টের জন্য আছে আলাদা প্লেন—এয়ার ফোর্স ওয়ান। সত্যি বলতে, এয়ার ফোর্স ওয়ান থাকলে সাধারণ বিমানে ওঠার ইচ্ছা মাথায় উঁকি দেওয়ার কথাও নয়।
হোয়াইট হাউসে থেকেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাধারণত জানালা খুলতে পারেন না। নিরাপত্তার কারণে সব জানালা সিল করা থাকে।
মিশেল ওবামা একবার মজা করে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব শেষ হলে তিনি প্রথম যে কাজটি করবেন, সেটি হলো জানালা খুলে বাতাস খাওয়া!
বারাক ওবামাক শুধু একবার ক্যাম্প ডেভিডে যাওয়ার পথে কয়েক মিনিটের জন্য জানালা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, সেটিই ছিল তাঁর বিরল ‘ছোট স্বাধীনতা’।
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজের অফিস পরিষ্কার করতে বা নিজের হাতে চিঠিপত্র ফেলে দিতে পারেন না।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল রেকর্ডস অ্যাক্ট অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের সব নথি, ই–মেইল ও চিঠিপত্র সংরক্ষণ করতে হয়। কোনো কাগজ ফেলার আগে তা যাচাই–বাছাই করে বিশেষভাবে সংরক্ষণ বা ধ্বংস করার নিয়ম।
তাহলে কি প্রেসিডেন্ট কিছুই করতে পারেন না
আইনের দৃষ্টিতে দেখলে, শেষ সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্টের হাতেই থাকে। চাইলে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে সিক্রেট সার্ভিসকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।
আবার আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নিজের নিরাপত্তা সুরক্ষা প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন না। ফলে নিরাপত্তাজনিত এসব নিয়ম ধীরে ধীরে একধরনের বাধ্যতামূলক প্রথায় পরিণত হয়েছে।
শেষ কথা
ক্ষমতা মানেই সীমাহীন স্বাধীনতা, এ ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়; বরং বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষের জীবনটাই অনেক দিক থেকে সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত।
নিজে গাড়ি চালানো, জানালা খোলা, সন্তানের স্পোর্টসে যাওয়া—আমাদের কাছে যেসব খুব সাধারণ, মার্কিন প্রেসিডেন্টের জীবনে সেসবই হয়ে ওঠে বিলাসিতা।
ক্ষমতার আড়ালে যে এতটা কড়াকড়ি নিয়ম লুকিয়ে থাকে, তা জানলে প্রেসিডেন্টের জীবনটাকে নতুন চোখে দেখতেই হয়।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট