
দেড় বছরে সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) নাগরিক ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে জটিলতা, অবকাঠামোগত উন্নয়নে স্থবিরতা ও মৌলিক সেবায় ঘাটতির কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগ অনেকগুণ বেড়েছে।
রাস্তা-ঘাট ও জলাবদ্ধতা
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর অনেকটাই দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার হয়নি। খানাখন্দে ভরা সড়কে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অল্প বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো। ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকর সংস্কার বা সম্প্রসারণে দৃশ্যমান কোনও বাস্তব পদক্ষেপ না থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
হকার উচ্ছেদ ও যানজট
নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত করতে একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও হকার উচ্ছেদ পুরোপুরি সফল হয়নি। হকারদের জন্য আলাদা শেড নির্মাণ করেও কোনও কাজ হয়নি। কিছুদিন শৃঙ্খলা থাকলেও পরে আবারও ফুটপাত দখল হয়ে যায়। এতে পথচারীরা পড়ছেন বিপাকে। অন্যদিকে যানজটও চরমে পৌঁছেছে। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ যানজট নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।
নাগরিক সনদ পেতে ভোগান্তি
নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিক সনদ, উত্তরাধিকার সনদসহ বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র পেতে নগরবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার ঘুরেও অনেকেই নির্ধারিত সময়ে সেবা পাননি।
নগরীর দাঁড়িয়াপাড়ার বাসিন্দা লেখক-কলামিস্ট জিবলু রহমান জানান, পাঁচ দিন ঘুরে তিনি তার লন্ডন প্রবাসী মামীর নাগরিক সনদ সংগ্রহ করেন।
সুপেয় পানির সংকট
নগরীতে সুপেয় পানির মারাত্মক সংকট রয়েছে। সিসিক সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ১০ কোটি লিটার। এর বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ৫ কোটি ৮০ লাখ লিটার। ফলে অনেক এলাকায় নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না বাসিন্দারা। গভীর নলকূপ ও বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
নগরীর জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা খালেদ আহমদ জানান, পানির অভাবে তিনি ৮ মাস ধরে পার্শ্ববর্তী এক আত্মীয়ের বাসায় বসবাস করছেন।
তিনি বলেন, নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কর্মকর্তাদের গায়ে জং ধরেছে। ৮ মাসে একটা পানির পাম্প ঠিক হয়নি। নয়া প্রশাসক এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে তার আশা।
পরিচ্ছন্নতা ও মশার উপদ্রব
সিসিকের কনজারভেন্সি বিভাগ নগরী পরিচ্ছন্ন রাখতে চেষ্টা চালালেও মশার উপদ্রব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। নিয়মিত চলেনি ফগিং কার্যক্রম। বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু ও অন্য মশাবাহিত রোগের আশঙ্কা বাড়ছে।
নগরীর ১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এনামুল হক জুবের দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর ড্রেনেজ সংস্কার, রাস্তা মেরামত, সুপেয় পানির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং সেবাপ্রদান প্রক্রিয়া সহজীকরণে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান তার।
নবনির্বাচিত প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী জানান, নগরীতে আগামী রবিবার থেকে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু হবে। বুধবার আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের পর ছয়টি বিষয় অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি কাজ করছেন।
অগ্রাধিকারগুলো হলো- পরিচ্ছন্নতা ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, মশক নিধন, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও ফুটপাত দখলমুক্তকরণ, নাগরিক সেবায় হয়রানি হ্রাস ও সিটি করপোরেশনের সব কার্যক্রমে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। এগুলো বাস্তবায়িত হলে নাগরিক ভোগান্তি অনেকাংশে কমে যাবে বলে তার মন্তব্য।