
লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার হোয়াইটচ্যাপেল রোডে ক্যাসাব্লাঙ্কা নামে একটি ক্যাফেতে লাঞ্চের ভিড়। কাচের কাউন্টারের পেছনে শিঙ্গাড়া, বিরিয়ানি আর হ্যাশব্রাউন (আলু দিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার) সাজানো। সেখানে বসে চা পান করতে করতে ব্যারিস্টার ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী খালেদ নূর জানান, কয়েক মাস ধরে লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একটিই আলোচনার বিষয়, দেশের আসন্ন নির্বাচন। বাংলাদেশে নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে মানুষ এ বিষয়ে কথা বলা থামায়নি।
কয়েক দশক ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠানো সত্ত্বেও জাতীয় নির্বাচনে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা ছিল না। আন্দোলনকারীরা যুক্তি দিয়েছিলেন, প্রবাসীদের বাদ দেওয়া অগণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ছিল। বিশেষ করে যেহেতু বিদেশের অনেক বাংলাদেশি রাজনৈতিক সহিংসতা বা দমনের মুখে দেশ ছেড়েছিলেন।
এক পর্যায়ে নিরবচ্ছিন্ন চাপের পর নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ বিদেশে ভোটার নিবন্ধন সম্প্রসারিত করেছে, যা প্রবাসীদের প্রথমবারের মতো দূর থেকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের মতে, বিদেশে ভোট চালু হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে ৭০ লাখেরও বেশি প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন– যা প্রায় ১২.৭ কোটি মোট ভোটারের ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের ধারণা অনুযায়ী সব মিলিয়ে বিদেশে প্রায় ১.৫ কোটি বাংলাদেশি বসবাস করছেন।
তবে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ভোট দিতে নিবন্ধিত হয়েছেন মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আকারের তুলনায় সামান্য। ২০২১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের প্রায় ছয় লাখ ৪৫ হাজার মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেন। যাদের সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব পূর্ব লন্ডনে। শুধু টাওয়ার হ্যামলেটসেই বাসিন্দাদের প্রায় ৩৫ শতাংশ বাংলাদেশি।
কিছু বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখনও লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের ধারণা, কিছু নির্বাচনী এলাকায় প্রবাসী ভোটাররা নিবন্ধিত ভোটারদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হতে পারে। যা প্রভাবিত করতে পারে ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ ব্যবস্থায় ফলাফলকে।
তবে বাস্তবে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশি, বিশেষ করে যারা যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা দেশের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে একাত্ম বোধ করেন কিন্তু তাদের কাছে নাগরিকত্বের নথিপত্র নেই। তারা তাই ব্যালট থেকে বাদ পড়েছেন। ফলে অনেককেই আবার বাংলাদেশে ভোটের বিষয়টি স্পর্শ করছে না। খালেদ নূর বলেন, তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যে এই ধরনের অনাগ্রহ সাধারণ। বছরের পর বছর ধরে বিতর্কিত নির্বাচন অনেককে আশাবাদী করলেও সতর্ক করে দিয়েছে। ভোট দিতে আপনার একটি জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক প্রয়োজন এবং তারপরে একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আরেকটি ডিজিটাল প্রক্রিয়া রয়েছে। অনেক মানুষের জন্য, বিশেষ করে প্রবীণ ভোটারদের জন্য এটি অত্যন্ত জটিল।