‘বিকট শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখি বাসটিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ট্রেন'

পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ১৯ জনের

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২২ মার্চ ২০২৬, ১২:২২

দেশের তিন জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জন, ফেনীতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন এবং হবিগঞ্জে বাসের সঙ্গে পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন।
জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
কুমিল্লা 
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে যাত্রীবাহী বাসে মেইল ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং দুই শিশু রয়েছে। তবে তাদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেডিকেল অফিসার অজয় ভৌমিক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত ৩টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় মামুন পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে যাওয়া মেইল ট্রেন। এই ধাক্কায় বাসটিকে অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায় ট্রেনটি। এতে প্রথমে ৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও পরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ জনে। 
ঘটনার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আখাউড়া থেকে রিলিফ ট্রেন এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। এছাড়াও ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব এ উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। সকাল ৮টার দিকে রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় রেলক্রসিংয়ের দুই গেটম্যানকে বরখাস্ত করা হয়। নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা ঘোষণা করেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ বের করতে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 
হবিগঞ্জ
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় বাসের সঙ্গে পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে নারীসহ চারজন নিহত হয়েছেন। শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাতে উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আন্দিউড়া এলাকায় আন্দিউড়া উম্মেতুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে এ দুর্ঘটনা ঘটে। 
তাৎক্ষণিকভাবে নিহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। নিহতদের মধ্যে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী রয়েছেন। 
রোববার (২২ মার্চ) বেলা সোয়া ১১টার দিকে বিষয়টি ঢাকা পোস্টকে নিশ্চিত করেছেন ঘটনাস্থলে থাকা মাধবপুর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) ইউসুফ। 
তিনি জানান, পিকআপ ভ্যানটি পাশে থাকা পুকুরে পড়ে আছে। এতে বাসাবাড়ির মালামাল ছিল। চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা পিকআপ ভ্যানের চালক ও যাত্রী। মরদেহগুলো হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তারা সিলেটের দিকে যাচ্ছিল নাকি সিলেট থেকে ফিরছিল তা বোঝা যাচ্ছে না। 
ফেনী
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর রামপুর এলাকায় বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। এতে গুরুতর আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। রোববার (২২ মার্চ) ভোর ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের মরদেহ ফেনী সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা রয়েছে। হতাহতদের নাম-পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মহিপাল হাইওয়ে থানা পুলিশের ইনচার্জ আসাদুল ইসলাম জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী-রামপুর এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী একটি লেনের কাজ চলছিল। এ সময় একটি অ্যাম্বুলেন্স ধীর গতিতে পার হচ্ছিল। এমতাবস্থায় শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। 
এ ঘটনায় বাস ও অ্যাম্বুলেন্স চালকের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হলে পেছনে মোটরসাইকেল ও আরও কিছু বাসের জট লেগে যায়। তার কিছুক্ষণ পর বেপরোয়া গতিতে আসা দোয়েল পরিবহনের একটি বাস জটলার মধ্যে ধাক্কা দেয়। এতে বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। এ সময় একজন মোটরসাইকেল আরোহী, বাসের সুপারভাইজার, ও একজন যাত্রী নিহত হন।

‘বিকট শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখি বাসটিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে ট্রেন'
কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে উঠে পড়া একটি বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনায় আহত বাস যাত্রী ওমর ফারুক বলেন, ‘আমি বাসে ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকি ও বিকট শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখি ট্রেন বাসটিকে মুখে করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাসের ভেতরটি দুমড়েমুচড়ে যায়।’
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওমর ফারুক এভাবেই দুর্ঘটনার সময়ের বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারান। চোখ খুলে দেখেন, তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। তাঁকে কারা এখানে এনেছেন, কখন এনেছেন, তিনি কিছুই জানেন না।
ঈদের দিন গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আজ রোববার সকালে ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মমিন প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজন পুরুষ, দুটি শিশু ও তিনজন নারী রয়েছেন।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ঢাকা মেইল ট্রেন রেলক্রসিং পার হচ্ছিল। আর মামুন স্পেশাল পরিবহনের বাসটি নোয়াখালীর দিকে যাচ্ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। সংঘর্ষের পর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া বাসটিকে টেনেহিঁচড়ে অনেকটা পথ নিয়ে যায় ট্রেনটি।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক সাইফুল বলেন, দিবাগত রাত তিনটার কিছু আগে ট্রেনের সঙ্গে বাস দুর্ঘটনার সংবাদ পান তাঁরা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সবাই মিলে হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। ধারণা করা হচ্ছে, বাসটি রেললাইনে উঠে যাওয়ার কারণে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা অজয় ভৌমিক বলেন, ‘হতাহতদের হাসপাতালে আনা হয় ভোর ৪টার দিকে। ১২ জনকে আমরা নিহত অবস্থায় এখানে পাই। আহতদের মধ্যে ৮ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হতাহতদের বেশির ভাগই মাথায় আঘাত পেয়েছেন। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে তাঁদের।’