অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কেন রাষ্ট্রপতিকে রক্ষায় অনড় ছিল বিএনপি

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন
ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৫৯

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রশাসন থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ—সবখানেই বড় পরিবর্তন আসে। পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি, সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী-ও পরে সরে দাঁড়ান। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কীভাবে পদে বহাল থাকলেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কমপক্ষে দুই দফা বঙ্গভবন ঘেরাও ও রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবিতে চাপ সৃষ্টি হলেও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে শপথও পড়ান।
দৈনিক কালের কণ্ঠ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।” তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও তাকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন পেয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।

কেন অনড় ছিল বিএনপি
রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণের দাবি যখন উঠছিল, তখন বিএনপির সিনিয়র নেতারা রাষ্ট্রপতির অপসারণের বিরোধিতার কথা বলেছিলেন প্রকাশ্যেই। তখন তারা এর পক্ষে 'রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে', 'সাংবিধানিক সংকট হতে পারে' কিংবা 'নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে' - এমন কিছু যেন না হয় সেই যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।
কিন্তু এখন আর বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি নন দলটি সিনিয়র নেতারা। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডঃ খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, এ নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে সেটি তার জানা নেই।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা স্থায়ী কমিটির আরেকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে তাদের অবস্থান ছিল এমন যে- যাতে করে এটিকে কেন্দ্র করে দেশের স্থিতিশীলতায় কোনো সংকট না হয়, যা সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও বিপন্ন করে তুলতে পারতো।
তার মতে, বিএনপি তখন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা ও দ্রুত নির্বাচন আদায়ের নীতি নিয়েছিল। তারা মনে করেছেন শেখ হাসিনার পতনের পর যখন সব সংবিধান অনুসরণ করেই হচ্ছিল, তখন অসাংবিধানিক পন্থায় রাষ্ট্রপতিকে সরানো হলে সেটি পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতো।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, শেখ হাসিনার পতনের পর শুরু থেকেই বিএনপি নির্বাচন চেয়ে আসছিল এবং নির্বাচন ঝুঁকিতে পড়বে এমন কিছুতেই দলটি সায় দিতে রাজি ছিলো না।
"রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে নির্বাচন অনিশ্চিত হোক সেটি তারা চায়নি। কারণ তারা জানতো যে যত দ্রুত নির্বাচন হবে তত তারা ভালো করবে। এজন্যই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছিল বলে আমার মনে হয়," বলেছেন তিনি।

বিএনপি নেতারা তখন যা বলেছিলেন
ঢাকায় ২২শে অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের পর দিন ২৩শে অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করে রাষ্ট্রপতি বিষয়ে আলোচনা করেন বিএনপির তিনজন সিনিয়র নেতা।
সেখান থেকে বেরিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দেশে যাতে নতুন করে সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারকে খেয়াল রাখতে বলেছেন।
ওইদিনই বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে এবং এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হবে। তাই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চায় না বিএনপি। তিনি তখন আরও বলেছিলেন,"এই পদটা একটা সাংবিধানিক পদ, একটা প্রতিষ্ঠান। সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। এই পদে হঠাৎ করে পদত্যাগের মাধ্যমে শূন্যতা সৃষ্টি হলে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্রীয় সংকটের সৃষ্টি হবে।"

‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ রক্ষার যুক্তি
রাষ্ট্রপতি সাক্ষাৎকারে বলেন, বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে তারা তার পাশে থাকবে। তিনি আরও দাবি করেন, তিন বাহিনীর প্রধানরা তাকে সমর্থন দেন এবং বলেন, “আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজয় মানে পুরো বাহিনীর পরাজয়।” রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক দল’ অসাংবিধানিক উপায়ে অপসারণের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।

বিএনপির বিষয়ে কী বলেছেন রাষ্ট্রপতি
সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে তাকে অপসারণের চেষ্টা হয়েছিল জানিয়ে রাষ্ট্রপতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তখন বিএনপির 'উচ্চপদে আসীন' নেতা তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, "আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই"।
রাষ্ট্রপতি জানান, তাকে অপসারণের ওই উদ্যোগটি এসেছিল গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে। তখন দলগুলো ও অন্তর্বর্তী সরকার একটি সিদ্ধান্তে আসে যে রাজনৈতিক দলগুলো চাইলেই কেবল তিনি অপসারিত হবেন।
"আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা একটা গ্রুপ হয়ে যায়। আর আরেকটা গ্রুপ হয়ে যায়, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। উদ্যোগটা ব্যর্থ হলো বিএনপি ও তাদের জোটের কারণে। একটা বৃহত্তর রাজনৈতিক দল যে স্ট্যান্ডটা নিয়েছে, সেটাকে সরকার তখন সমর্থন করতে বাধ্য হলো," সাক্ষাৎকারে কালের কণ্ঠকে বলেছেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি আরও বলেছেন, বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাকে তখন এই বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে তিনি যেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অবিচল থাকেন এবং কোনো অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি অপসারণের পক্ষে তারা নয়।
"এ ছাড়া তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে। তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, 'মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।' শেষ পর্যন্ত তারা এটা করেছে," ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
ওই সময়টিকে কঠিন সময় আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন এবং তাঁরা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।
"বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল," বলেছেন তিনি।

আন্দোলন ও বিতর্ক
২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ সম্পর্কে তিনি শুনেছেন, তবে দালিলিক প্রমাণ পাননি। এ বক্তব্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মহলে।
২২ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বঙ্গভবনের সামনে বিক্ষোভ হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি পালন করে। এক পর্যায়ে ব্যারিকেড ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টাও হয়, পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।