
হবিগঞ্জের বাহুবলে গৃহবধূ হত্যাকাণ্ডের রহস্য জট খুলতে শুরু করেছে। বেয়াইকে ফাঁসাতে নিজের বোনের সতীনকে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল গণির বিরুদ্ধে।
এই হত্যাকাণ্ডে গণির উদ্দেশ্য ছিল— মারামারি মামলায় জেল খাটানোর প্রতিশোধ নেওয়া এবং বোনকে সতীনের সংসার থেকে বের করে আনা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মামলাটি পরিচালনাও করছিলেন তিনি। কিন্তু বিধিবাম। তদন্তে বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর তার পক্ষ নেন মামলার বাদি নিহত নাজমা আক্তারের মেয়ে নার্গিস আক্তার। তিনি আদালত থেকে জামিন করান সৎ মামা আব্দুল গনিকে।
এদিকে মামলার বাদি নার্গিস আক্তার সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, মামলায় দেওয়া আসামিদের পক্ষ নিচ্ছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তিনি মামলার বাইরে গিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করছেন।
অপরদিকে নিহতের ভাই মো. মনির মিয়া বলছেন, আব্দুল গনি তার বোনের সংসার থেকে সতীনকে সরিয়ে দিতেই আমার বোনকে হত্যা করেছেন। এখন তিনি আমার বোনের দেবর তোরাব আলীকে ফাঁসাতে চান। কারণ তোরাব আলীকে তিনি বেশ কিছুদিন পূর্বে পিটিয়েছিলেন। তখন তোরাব আলী মামলা করলে তিনি জেল খাটেন। এর প্রতিশোধ নিতেই এই হত্যাকাণ্ড।
কাজিহাটা গ্রামের বাসিন্দা ইউপি সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, শুনেছি আসামি আব্দুল গনির ছেলের সঙ্গে নিহত নাজমা আক্তারের মেয়ে নার্গিস আক্তারের বিয়ে হয়েছে। সে অনেক দিন ধরে এলাকায় থাকেও না। স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকে বলে শুনেছি। সেখানে কী করছে তাও জানি না। তিনি বলেন, মেয়েটি এলাকার নিরিহ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত তার চাচা তোরাব আলী, সেলিম মিয়াদের আসামি করতে চায়। এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এলাকার মানুষের ধারণা কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মেয়েটি তাদের আসামি করতে চাচ্ছে। সম্প্রতি আব্দুল গনি হঠাৎ করেই বাড়িঘর বিক্রি করে দিয়েছে। শুনেছি হবিগঞ্জ শহরে কোথাও জায়গা কিনেছে।
নারী ইউপি সদস্য ফুলমা রানী দেব বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে তেমন কিছু বলতে চাই না। তবে ইশারায় তো বুঝতেই পারছেন আসল ঘটনাটি কী।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইর ইন্সপেক্টর রাজিব কুমার দাশ জানান, মামলায় মোট ১০ জনের নাম উল্লেখ করেন বাদী। এর মধ্যে একজন আসামির (৯নং আসামী আব্দুন নূর) বিরুদ্ধে কোনো মামলা মোকদ্দমার কোন রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এছাড়া অন্য আসামিদের প্রায় সবার সঙ্গেই আব্দুল গনির একাধিক মামলা রয়েছে। ঘটনার পর থেকেই নিহতের সতীনের ভাই আব্দুল গনিই মূলত মামলাটি পরিচালনা করছেন। বাদি নিহতের মেয়ে হলেও সে শুধু কাগজেই ছিল।
তদন্তকালে গনির কাছে নূরকে কেন আসামি করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে অত্যন্ত দুষ্ট প্রকৃতির লোক। সে সব ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকতে পারে। তাই তাকে আসামি করা হয়েছে।
ইন্সপেক্টর রাজীব আরও বলেন, আমাদের সন্দেহ হয় শুধু একটি লোক দুষ্ট তাই তাকে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে। এটি হতে পারে না। এরপর নূরকে গ্রেফতার করি। তখন আমরা জানতে পারি নূর একজন দৈনিক মজুরীভিত্তিক শ্রমিক। তাকে ধরার পরই আসলে মামলার মোর ঘুরে যায়। সে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে আদালতকে জানায়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সে দেখে ফেলেছিল। তাই তাকে আসামি করা হয়েছে। পরবর্তীতে অধিকতর তদন্ত করে আব্দুল গনিকে গ্রেফতার করি।
তিনি বলেন, এখন যেহেতু বাদিকে গনির ছেলে বিয়ে করেছেন, সে সুযোগটাই নিচ্ছেন গনি। বাদিকে দিয়ে মামলাটি প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। মামলার তদন্তও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন এ নিয়ে প্রশ্ন উঠা খুবই দুঃখজনক।
জানা যায়, কাজিহাটা গ্রামের বাসিন্দা জসিম মিয়ার প্রথম স্ত্রী নাজমা আক্তার। তার একমাত্র সন্তান নার্গিস আক্তার। বেশ কয়েক বছর ধরেই নার্গিসের প্রেমের সম্পর্ক ছিল সৎ মামা আব্দুল গনির ছেলের সঙ্গে। এদিকে গনির সঙ্গে নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ছিল একই গ্রামের বাসিন্দা তার বোনের দেবর তোরাব আলী ও সেলিম মিয়ার। তাদের মধ্যে মামলা মোকদ্দমাও রয়েছে। গত বছরের ২০ অক্টোবর বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি বাঁশঝাড়ে নাজমার মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তার মেয়ে নার্গিস আক্তার বাদি হয়ে তার চাচাসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন। শুরু থেকেই মামলার নিয়ন্ত্রণ ছিল নিহতের সতীনের ভাই আব্দুল গনির হাতে।
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই বলছে, নিহতের সুরতহাল রিপোর্ট করার সময় তার শরীর ও গায়ের কাপড় ভেজা ছিল। তার শরীরে কোনো রক্ত ছিল না। অনেকটা দেখাতে গোসল করানোর মতো। তার গলায় কাটা দাগ পাওয়া যায়। মামলাটির তদন্তও প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যেই সব ক্লু বেরিয়ে এসেছে। খুব শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে।