ডিসি সারোয়ারের সিলেট ছাড়ার কারণ জানা গেল

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০৫

সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে আকস্মিক প্রত্যাহারের ঘটনায় জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রোববার সরকারের প্রজ্ঞাপনে এই বদলিকে ‘জনস্বার্থে’ বলা হলেও সিলেটের সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ ও সচেতন মহলের দাবি-হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের দানবাক্স সংস্কার এবং আয়ের টাকার স্বচ্ছতা আনার সাহসী উদ্যোগের কারণেই তাকে ‘বলি’ হতে হয়েছে। এই প্রত্যাহারের আদেশ আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় বইছে এবং নেটিজেনদের বেশির ভাগই বিদায়ি ডিসির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শুধু ভার্চুয়াল জগতেই নয়, এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ও ডিসির পুনর্বহালের দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছেন সিলেটের মানুষ। জেলাজুড়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলন চলছে।
রোববারই ‘সিলেটের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে নগরীতে বিশাল মানববন্ধন হয়। সোমবার সকাল থেকেও জেলা প্রশাসক কার্যালয় এবং বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্টের সামনে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। ‘সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ’, ‘সিলেটের যুবসমাজ’ ও ‘সিলেটের সচেতন তরুণ’-এমন নানা ব্যানারে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সি সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। বিক্ষোভ থেকে ‘ডিসি সারওয়ারের প্রত্যাহার মানি না, মানব না’, ‘সিলেটবাসীর দরকার, ডিসি সারওয়ার’ ইত্যাদি স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে চারপাশ। বক্তারা বলেন, জেলা প্রশাসক সিলেটে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বলেই একটি প্রভাবশালী মহল ষড়যন্ত্র করে তাকে সরিয়ে দিয়েছে।
সোমবার সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে প্রবেশের সময় কার্যালয়ের সামনে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের সাথে করমর্দন করেন বিদায়ি ডিসি মো. সারওয়ার আলম। পরে সাধারণ মানুষের স্লোগানের মধ্যেই তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এরপর দুপুরে তিনি নিজ কার্যালয় থেকে বের হয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে যান।
জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম অত্যন্ত ভালো মানুষ। যেখানে মাজারের দানের টাকা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পায়নি, সেখানে তিনি স্বচ্ছতা আনতে সাহস করেছিলেন। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এই টাকা দিয়েই মাজারের প্রভূত উন্নয়ন হতো। মাত্র ৪ দিনে যেখানে ১৭ লাখের ওপর টাকা আসে, সেখান থেকে অনুমেয় অন্য সময় কত টাকা আসে। কিন্তু এসব টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা করে যারা খাচ্ছেন, তাদেরই রোষানলে পড়তে হলো জেলা প্রশাসককে।
তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানিয়ে বলেন, অন্তত এই ভালো কাজটিসহ সব উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বার্থে সারওয়ার আলমকে আরও এক বছর সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসাবে রাখা হোক।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার বলেন, যদিও সরকার যে কোনো কর্মকর্তাকে বদলি বা পদায়ন করতে পারে, কিন্তু ডিসি সারওয়ার আলমের ক্ষেত্রে সিলেটের মানুষের ধারণা-মাজারের দানের টাকার স্বচ্ছতা বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণেই সুবিধাভোগীরা তাকে বদলি করিয়েছে। যদি এ কারণেই তাকে বদলি করা হয়, তবে তা হলো অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতিকে উসকে দেওয়া। স্বচ্ছতা চাওয়ায় শাস্তি হলে কেউ আর সাহস করে ভালো কাজ করবে না। দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দানের টাকা কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে সবারই প্রশ্ন ছিল, আর সেই কাজটিই তিনি করেছিলেন। দিন শেষে এই বদলি রাষ্ট্রের জন্য বড় ক্ষতি।
মো. সারওয়ার আলমের বদলির খবরটি আসার পর থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদায়ি ডিসির ছবি শেয়ার করে তার সততা ও সাহসিকতার প্রশংসা করছেন।
নিজের প্রত্যাহারের আদেশ আসার পরদিন সোমবার বাদ জোহর ওয়াকফ স্টেটের কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে মাজারে যান জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। নির্দেশ দেন গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া দানবাক্সগুলো খুলে দানের অর্থ গণনা করতে। 
স্থানীয়রা মনে করেন, যে বাক্সগুলো একমাস পর খোলার কথা ছিল, তা প্রত্যাহারের আদেশের পর দিনই খোলার নির্দেশ দিয়ে জেলা প্রশাসক বুঝিয়েছেন যে, এই দান বাক্সের কারণেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদিও জেলা প্রশাসক সরওয়ার আলমের কাছে জানতে চাওয়া হয় এ কারণেই তার প্রত্যাহার কিনা? এ সময় তিনি বলেন, তিনি এই মুহূর্তে কিছুই বলবেন না। পরে তিনি একটি ভিডিও বার্তা দেবেন। যদিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো ভিডিও বার্তা দেননি।

দানবাক্সে বিপুল টাকার সঙ্গে ডলার স্বর্ণ
শাহজালাল (রহ.) মাজারের প্রায় ৭শ’ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো দানবাক্সের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়েছে। মাজার কর্তৃপক্ষের আপত্তি ও অসন্তোষের মধ্যেই সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই গণনা হয়। দানের অর্থ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ও সিলগালা করা তিনটি বড় ডেগ খোলা হয়। মাত্র তিন দিনে জমা হওয়া দানবাক্স ও ডেগগুলো থেকে নগদ ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫৫৯ টাকা পাওয়া গেছে।
জানা যায়, নগদ টাকার বেশির ভাগই ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট হলেও এতে প্রচুর ১০০, ৫০, ২০ ও ১০ টাকার নোট ছিল। দেশি মুদ্রা ছাড়াও সোনা, রিয়াল, ডলার ও পাউন্ড মিলেছে। এছাড়াও ছোট ছোট সোনার টুকরোও রয়েছে। মেশিন দিয়ে টাকা গণনার এই কাজে দরগাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ ৩৯ জন স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত ছিলেন। 
এর আগে গত ১২ জুন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শনে গিয়ে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসাবে গত বৃহস্পতিবার বিকালে মাজারের ঐতিহাসিক তিনটি ডেগ সিলগালা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগের পর মাজার সংশ্লিষ্টদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সমালোচনার মুখে রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসাবে নিযুক্ত করা হয়।
ডিসি সারওয়ার আলম ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১৫ দিন পর টাকা গণনা করা হবে। তবে প্রত্যাহার আদেশের পর সিলেট ছাড়ার আগে গতকাল তড়িঘড়ি করে তিনি নিজেই উপস্থিত থেকে গণনার কাজ শুরু করেন। যদিও গণনার কিছু পরই তিনি মাজার ত্যাগ করেন।