
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের বাবা মোহাম্মদ আব্দুল মতিনের দ্বিতীয় বিয়ে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের দেওয়া অনুদানের অর্থ ব্যবহার করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মোহাম্মদ আব্দুল মতিন দাবি করেছেন, নিজের উপার্জনের টাকায় এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতি নিয়েই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।
জানা গেছে, মোহাম্মদ আব্দুল মতিন (৫০) ঢাকার মতিঝিলে আলফা গ্রুপের একটি শাখায় সেলস ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। উপজেলার মাইজবাগ ইউনিয়নের কুমড়াশসন গ্রামের বাসিন্দা তিনি। তার প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম (৪৫)। তাদের একমাত্র ছেলে শেখ শাহরিয়ার বিন মতিন ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন। এছাড়া তাদের ১০ বছর বয়সি একটি মেয়ে রয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ৭ নভেম্বর আব্দুল মতিন ও মমতাজ বেগমের বিয়ে হয়। দীর্ঘ ২২ বছরের দাম্পত্য জীবনের পর চলতি বছরের ২৯ মে দ্বিতীয় বিয়ে করেন আব্দুল মতিন। এরপর থেকেই পরিবারে বিরোধ চরম আকার ধারণ করে।
অভিযোগ রয়েছে, শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের দেওয়া অনুদানের অর্থ থেকে ৭ লাখ টাকা কাবিন এবং প্রায় সোয়া পাঁচ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার কিনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন আব্দুল মতিন। দ্বিতীয় বিয়ের খবর জানার পর গত ২ জুন মেয়ে শেখ মুমতাহিনা বিনতে মতিনকে নিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন প্রথম স্ত্রী মমতাজ বেগম। তবে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে তাকে নির্বৃত্ত করেন।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, শহীদ শাহরিয়ারের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন সময় আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টার সঙ্গেও আব্দুল মতিন জড়িত ছিলেন। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
শহীদ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম বলেন, ‘সন্তান হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতেই পারিনি। এর মধ্যেই আমার অনুমতি ছাড়াই আব্দুল মতিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। তিনি দাবি করছেন আমি সম্মতি দিয়েছি, কিন্তু সেটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার জানামতে, তার নিজের সামর্থ্যে এত দামি স্বর্ণালংকার কেনা সম্ভব নয়। আমার শহীদ ছেলের জন্য পাওয়া সরকারি অনুদানের টাকার ওপর ভর করেই তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘শহীদ পরিবারের জন্য বরাদ্দ ৩০ লাখ টাকা উত্তোলনের উদ্দেশ্যে তার স্বাক্ষর জাল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এছাড়া শহীদ ছেলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ারও চেষ্টা করেছেন আব্দুল মতিন।’
তবে সব অভিযোগ নাকচ করে মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, ‘বংশ রক্ষার স্বার্থে এবং আমার মায়ের অনুরোধে দ্বিতীয় বিয়ে করেছি। বিয়ের আগে আমার প্রথম স্ত্রী এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। এখন তিনি তা অস্বীকার করছেন। আমি চাকরি করি এবং নিজের উপার্জনের টাকায় বিয়ে করেছি। শহীদ ছেলের অনুদানের টাকা দিয়ে বিয়ে করেছি, এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয় বিয়ের পর পাঁচবার প্রথম স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাইনি। বর্তমানে বিষয়টি পারিবারিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
এ বিষয়ে জুলাই সমন্বয়ক ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নাকিব বলেন, ‘আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারেন। তবে এমন সিদ্ধান্ত এমনভাবে নেওয়া উচিত, যাতে পরিবারের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়। বিশেষ করে একজন জুলাই শহীদের পরিবারের ক্ষেত্রে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে শহীদদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ‘একজন জুলাই শহীদের বাবা হিসেবে মতিন সাহেবের এমন সিদ্ধান্ত আমাদের ব্যথিত করেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই সিদ্ধান্ত মোটেও সমীচীন হয়নি। শহীদ পরিবারের প্রতি মানুষের যে সম্মান ও প্রত্যাশা রয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারী (শহীদ ও আহত সেল) আল নূর আয়াস বলেন, ‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের একটি কন্যাসন্তানও রয়েছে। তাকে নিয়েই সংসার পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। এ ধরনের সিদ্ধান্ত শহীদ পরিবারের মর্যাদা ও মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’