‘দেশের বাড়ি বলা নিষেধ’ — আইন মন্ত্রণালয়ে সেই নির্দেশের কারণ জানালেন আসিফ নজরুল

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০০:১১


আইন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তাদের নিজের ‘দেশের বাড়ি’ কোথায়, তা বলতে নিষেধ করেছিলেন সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তার মতে, বাংলাদেশে পরিচয়পর্বের শুরুতেই দেশের বাড়ি নিয়ে আলোচনা করার প্রবণতা অনেক সময় খাতিরের সম্পর্ক তৈরি কিংবা অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার পথ তৈরি করে। এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট জেলার মানুষ বাড়তি সুবিধা পাওয়া কিংবা কোনো কোনো জেলার মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগও তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক পোস্টে আইন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময়কার একটি অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এসব কথা বলেন আসিফ নজরুল।
তিনি লেখেন, ‘স্যার, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। দেশের বাড়ি …’
এরপর তিনি ওই ব্যক্তিকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে দেশের বাড়ি বলা নিষেধ। মনে থাকবে?’
পোস্টে আসিফ নজরুল জানান, আইন মন্ত্রণালয়ে পুরোপুরি অফিস করার প্রথম দিন ছিল ১০ আগস্ট ২০২৪। সেদিন প্রচণ্ড ব্যস্ততার পর বিকেলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছিলেন তিনি। তাদের অনেকেই তার সাবেক ছাত্র ছিলেন। আনুষ্ঠানিক পরিচয়পর্বের সময় প্রথম একজন দেশের বাড়ি বলতে শুরু করলে তাকে থামিয়ে দেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘প্রথমজন যিনি দেশের বাড়ি বলতে চাইল তাকেই আটকানো হলো। সবাই টের পেল, আমি সিরিয়াস এ বিষয়ে। দেশের বাড়ি কোথায়, তা আমার কাছে বলা যাবে না।’
এই নির্দেশ দেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন সাবেক এই আইন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বহু মানুষের মধ্যে পরিচয়পর্বের সঙ্গে সঙ্গে ‘দেশের বাড়ি কোথায়’—এ নিয়ে কথা বলার একটি প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময় এর উদ্দেশ্য থাকে খাতিরের সম্পর্ক তৈরি করা বা অনৈতিক সুবিধা নেওয়া।
তিনি লেখেন, ‘মন্ত্রীর বাড়ি কোন জেলার হলে, সেই জেলার লোক চাকরিতে বাড়তি সুবিধা পাবে—এটাই যেন নিয়ম বাংলাদেশে।’ একই ধরনের প্রবণতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ক্ষমতাবান শিক্ষকের মধ্যেও দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের মানুষের মধ্যে থাকা এই আঞ্চলিকতার উদাহরণ দিতে গিয়ে সংবিধানের একটি বিধানের কথাও তুলে ধরেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, জন্মস্থানের ভিত্তিতে কারো সঙ্গে বৈষম্য করা যাবে না—এমন বিধান বাংলাদেশের সংবিধানে রয়েছে।
তার ভাষায়, ‘আমাদের সংবিধানে লেখা আছে, জন্মস্থানের ভিত্তিতে কারো সঙ্গে বৈষম্য করা যাবে না। এমন কথা পৃথিবীর খুবই কম সংবিধানে লেখা আছে। আমাদের মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা আছে বলেই ১৯৭২ সালে এই অতি বিরল বিধান যুক্ত করা হয়েছিল সংবিধানে।’
তবে বাস্তবে এই সাংবিধানিক বিধান কতটা মানা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। সাংবিধানিক আইনের ক্লাসে শিক্ষার্থীদের করা একটি প্রশ্নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি লেখেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কোন জেলার মানুষ বেশি সুবিধা পেত—এ প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থীরা ‘গোপালগঞ্জ’ বলত। আবার কোন জেলার মানুষের বিরুদ্ধে বৈষম্য করা হতো—এ প্রশ্নে কেউ ‘ফেনী’, কেউ ‘বগুড়া’ বলত।
আসিফ নজরুল বলেন, ‘অন্য দলগুলোর উদাহরণ নেই। কেউ ভুল করে না বলতে, কার আমলে কোন জেলার লোক সুবিধা পায়, কাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য হয়।’
আইন মন্ত্রণালয়ে তার পূর্বসূরির বিরুদ্ধেও এ ধরনের বদনাম ছিল বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, সে কারণেই তিনি বিষয়টি নিয়ে সতর্ক ছিলেন। তার নির্দেশের পর মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করা পুরো সময় আর কোনো কর্মকর্তা তার কাছে দেশের বাড়ি কোথায় তা বলার চেষ্টা করেননি।
তবে মন্ত্রণালয়ের বাইরের লোকদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আসিফ নজরুল লেখেন, কর্মব্যস্ত একদিনে অনেক অনুরোধের পর এক ব্যক্তি তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। মাঝবয়সী ওই ব্যক্তি তাকে কিছু না বলে হঠাৎ নিজের বাড়ির পরিচয় দিতে শুরু করেন।
আসিফ নজরুলের ভাষায়, ‘আমি বললাম, ‘বসেন! কেন এসেছেন, প্লিজ তাড়াতাড়ি বলেন।’
কিন্তু ওই ব্যক্তি বসেননি। বরং গা দোলাতে দোলাতে বলেন, ‘স্যার, আমার বাড়ি নেত্রকোনা।’
এরপর তিনি আরও বলেন, ‘নেত্রকোনা, কেন্দুয়া থানা!’
তখনই ওই ব্যক্তির কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন বলে জানান আসিফ নজরুল। কারণ নেত্রকোনার কেন্দুয়া হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি।
তিনি লেখেন, ‘এতক্ষণে রহস্য বুঝতে পারলাম আমি। হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি সেখানে। কিন্তু আমাকে এটা বলার দরকার কী? কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।’
ওই ব্যক্তিও তার প্রতিক্রিয়ায় অবাক হয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। আসিফ নজরুলের বর্ণনায়, ‘মনে হলো, তিনি বুঝতে পারছেন না, কেন তাকে এখনই খুশিতে জড়িয়ে ধরছি না!’
এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটেছে উল্লেখ করে পোস্টের শেষ দিকে নিজের বাবার বাড়ির এলাকার মানুষের প্রসঙ্গও টেনে আনেন সাবেক আইন উপদেষ্টা।
তিনি লেখেন, ‘এমন ঘটনা আরও ঘটতো। সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনা হতো আমার বাবার বাড়ির লোকদের নিয়ে। ঠিক সেখানকার এতো অসংখ্য মানুষ যে ঢাকায় থাকেন তা নতুন জানা হলো আমার উপদেষ্টা জীবনে।’