
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এক আইনজীবীকে আর্থিক দণ্ড (খরচা আরোপ) মওকুফের আবেদন ও শুনানিকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন এক ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (০৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে শুনানি চলাকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে বিচারপতির কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিচারকাজ অসমাপ্ত রেখেই প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন এবং এরপর ওই দিন আর আদালত বসেনি।
নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ সংক্রান্ত একই বিষয়ে একাধিক রিট মামলা দায়ের করার ক্ষেত্রে তথ্য গোপন এবং প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগে রিটকারী মো. নুর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে ৫ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা কস্ট আরোপ করে আপিল বিভাগ। আদালত নির্ধারিত এই জরিমানার অর্থ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। দণ্ডিত রিটকারী নুর আলমের পক্ষে মামলা পরিচালনা করছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
অপরদিকে, অপর নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অনীক আর হক, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. শিশির মনির এবং আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত।
দুপুর ১২টার পর আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাসে অন্যান্য কার্যক্রম শেষে এই মামলার প্রসঙ্গটি সামনে আসে। কার্যতালিকার ১৩ নম্বর আইটেম বা নির্ধারিত মামলাগুলোর শুনানি শেষ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি আদালতকে জানান, একজন জুনিয়র আইনজীবীর ওপর ৫ লাখ টাকার খরচা আরোপ করা অত্যন্ত বেশি হয়ে গেছে এবং তা পরিশোধ করা তার জন্য দুরূহ। তাই আদালতের কাছে তিনি ওই জরিমানা মাফ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান।
কথা প্রসঙ্গে মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আপিল বিভাগে আগের মতো নির্বিঘ্নে মামলা শুনানি হচ্ছে না, যার ফলে আইনজীবীদের আয়-রোজগারও অনেকাংশে কমে গেছে। এই মন্তব্যের পরেই এজলাসে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। প্রধান বিচারপতি তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, তার দায়িত্ব গ্রহণের ফলে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে এমন মন্তব্য আদালত অবমাননার শামিল। এরপর দুপক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও বাগবিতণ্ডা শুরু হয়।
একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা আজ আর বসব না এবং এরপরই তিনিসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতি বেঞ্চ ছেড়ে দ্রুত এজলাস ত্যাগ করেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্র জানায়, এরপর ওই দিন আপিল বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম আর শুরু হয়নি।
এজলাস ত্যাগের ঘটনার পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে তাৎক্ষণিক এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কাছে পুরো বিষয়টি পরিষ্কার করেন।
তিনি দাবি করেন, আইনজীবীদের একটি পেশাগত প্রতিনিধি হিসেবে তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং আদালতের কাছে আবেদন করার সাংবিধানিক ও পেশাগত বাধ্যবাধকতা তার রয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম যে আগে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি নিয়ে তিনটি পৃথক বেঞ্চ পরিচালিত হতো। বর্তমানে বেঞ্চ কমে একটিমাত্র হওয়ায় মামলার জট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চেম্বার আদালতে কোনো মামলা স্থগিত (স্টে) হলে তার চূড়ান্ত শুনানি হতে দীর্ঘ এক বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। কার্যতালিকায় মামলা উপরে বা নিচে নামার ক্ষেত্রেও আইনজীবীরা ঠিকমতো মেনশন বা নিবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন না। বিচারপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি আরও যোগ করেন যে, আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে মামলার সংখ্যা কমে যায় এবং পরিণামে আইনজীবীদের আয়ও কমে যায় এটি একটি বাস্তব সত্য। তিনি এমন রিঅ্যাকশনের কথা বিন্দুমাত্র চিন্তা করেননি বলে উল্লেখ করেন।
প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিদের এভাবে এজলাস ছেড়ে চলে যাওয়ার আকস্মিক ঘটনাটিকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।
তবে এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেন যে, প্রধান বিচারপতির এজলাস ত্যাগের এই ঘটনাটিকে গণমাধ্যম বা বাইরে অতিরিক্ত বাড়িয়ে বা অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের উভয় অঙ্গন ও আইনজীবীদের মাঝে এই ঘটনাটি নিয়ে দিনভর তীব্র আলোচনা ও গুঞ্জন চলতে থাকে।