যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল অর্থায়ন হারানোর ঝুঁকিতে রাজ্যগুলো

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:১০

যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল অর্থায়ন গ্রহণকারী রাজ্যগুলোর সরকারি সংস্থাগুলোকে অনথিভুক্ত বা বৈধ অভিবাসন মর্যাদা নেই—এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে ফেডারেল কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন এই আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে নিউইয়র্কে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এর ফলে অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে সরকারি সেবা গ্রহণ নিয়ে ভীতি ও অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (ডিওজে) অফিস অব লিগ্যাল কাউন্সেল (ওএলসি) গত ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক আইনি মতামতে ফেডারেল আইনটির নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, টেম্পোরারি অ্যাসিস্ট্যান্স ফর নিডি ফ্যামিলিজ (টিএএনএফ) ও সাপ্লিমেন্টাল সিকিউরিটি ইনকাম (এসএসআই)-এর মতো ফেডারেল কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মসূচি পরিচালনাকারী সংস্থা নয়, রাজ্যের অন্যান্য সরকারি সংস্থার ওপরও নির্দিষ্ট তথ্য প্রতিবেদন করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
ডিওজের এই মতামত ১৯৯৬ সালের পার্সোনাল রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড ওয়ার্ক অপরচুনিটি রিকনসিলিয়েশন অ্যাক্টের একটি ধারার ব্যাখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ওএলসির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আইনে ব্যবহৃত ‘স্টেট’ শব্দের আওতায় রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সরকারি সংস্থাও পড়তে পারে। ফলে টিএএনএফ ও এসএসআই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী রাজ্যগুলোকে ফেডারেল আইনের অধীনে নির্দিষ্ট অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (ডিএইচএস) কাছে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
পুরোনো ব্যাখ্যা প্রত্যাহার
ডিওজে জানিয়েছে, নতুন মতামতের মাধ্যমে ১৯৯৮ সালে দেওয়া ওএলসির একটি পূর্ববর্তী আইনি ব্যাখ্যা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ওই ব্যাখ্যায় তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব মূলত টিএএনএফ ও এসএসআই পরিচালনাকারী নির্দিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।
নতুন ব্যাখ্যাটি ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে ডিওজে। একই সঙ্গে ১৯৯৮ সালের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে অতীতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেসবের জন্য রাজ্যগুলোর ওপর রেট্রোঅ্যাকটিভ বা অতীত-প্রযোজ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছে বিভাগটি।
ডিওজের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন আইনি মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হলে ফেডারেল অর্থায়ন হারানোর মতো গুরুতর পরিণতি হতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সব ৫০টি অঙ্গরাজ্য, ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া এবং কয়েকটি মার্কিন টেরিটরি টিএএনএফ ও এসএসআই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে।
নিউইয়র্কে অভিবাসী সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
ডিওজের নতুন ব্যাখ্যার কঠোর সমালোচনা করেছে নিউইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশন (এনওয়াইআইসি)। ৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুরাদ আওয়াদেহ বলেন, প্রশাসনের এই পদক্ষেপ অভিবাসীদের ওপর চাপ বাড়াবে এবং রাজ্য সরকারগুলোকে ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এনওয়াইআইসির মতে, নতুন নীতির কারণে অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমারেখা নিয়েও নতুন আইনি প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
সংগঠনটি আরও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাদের ওপর অতিরিক্ত অভিবাসন প্রয়োগের চাপ অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করে এনওয়াইআইসি। তবে এসব বক্তব্য সংগঠনটির নিজস্ব নীতিগত অবস্থান হিসেবে বিবেচিত।
ফেডারেল অর্থায়ন বনাম রাজ্যের নীতি
ডিওজের বক্তব্য হলো, ফেডারেল কর্মসূচির অর্থ গ্রহণকারী রাজ্যগুলোকে সেই অর্থের সঙ্গে সম্পর্কিত ফেডারেল আইনের শর্ত মেনে চলতে হবে। বিভাগটি বলছে, নতুন মতামতের মাধ্যমে কোনো নতুন আইন তৈরি করা হয়নি; বরং বিদ্যমান আইনের অর্থ ও প্রয়োগের পরিধি নতুনভাবে স্পষ্ট করা হয়েছে।
তবে অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এই ব্যাখ্যা বাস্তবায়িত হলে রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের মধ্যে ক্ষমতার সীমা নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোন তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কোন সরকারি সংস্থা তা সরবরাহ করবে, কখন তথ্য দিতে হবে এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা কীভাবে রক্ষা করা হবে—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নিউইয়র্কে সম্ভাব্য আইনি লড়াই
অভিবাসন আইন প্রয়োগে ফেডারেল সরকারের ভূমিকা এবং রাজ্য সরকারের নিজস্ব নীতির সম্পর্ক নিয়ে নিউইয়র্কে এরই মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে রাজ্য ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে ফেডারেল ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস) কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নিয়েও বিভিন্ন আইনি বিরোধ দেখা গেছে।
নতুন ওএলসি মতামত বাস্তবায়িত হলে রাজ্য সরকার, অভিবাসী অধিকার সংগঠন এবং ফেডারেল সরকারের মধ্যে নতুন করে আইনি লড়াই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ফেডারেল অর্থায়নের শর্ত হিসেবে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছ থেকে অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া কতটা আইনসঙ্গত এবং তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—এ ধরনের প্রশ্ন আদালতে উঠতে পারে।
নিউইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশন জানিয়েছে, অভিবাসী ও শরণার্থীদের অধিকার রক্ষায় তারা তাদের নীতিগত ও আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। নিউইয়র্কের ২০০টিরও বেশি অভিবাসী ও শরণার্থী অধিকার সংগঠনের জোট হিসেবে কাজ করা এনওয়াইআইসির সমালোচনার মধ্যেই ডিওজের নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হচ্ছে।
ফলে ফেডারেল অর্থায়ন, রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগের মধ্যে সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্য ও ফেডারেল সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।