
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি অব্যাহত রাখতে মোট ৩৩০ কোটি ডলারের কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনমনীয় ঋণ সম্পর্কিত স্থায়ী (এসসিএনসিএল) কমিটির সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত মোট অর্থের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের একটি নতুন প্রকল্পের জন্য ২০ কোটি ডলার এবং জ্বালানি খাতের জরুরি আমদানির জন্য ভূতাপেক্ষ অনুমোদনে ৩১০ কোটি ডলারের ঋণ রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) বাস্তবায়নাধীন ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কমিটি।
সভায় উপস্থাপনের জন্য তৈরি ইআরডির কার্যপত্রে বলা হয়েছে, এডিবির এ ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ স্প্রেড যুক্ত করে। ২৫ বছর মেয়াদি এ ঋণে পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। এ ছাড়া শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম ও শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ রয়েছে। ঋণটির গ্র্যান্ট এলিমেন্ট মাত্র ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। এটি ২৫ শতাংশের নিচে হওয়ায় ঋণটি কঠিন শর্তের বা অনমনীয় ঋণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অনুমোদিত ২০ কোটি ডলার ঋণের প্রধান লক্ষ্য হলো ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো।
২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের জুলাই মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য এ প্রকল্পের আওতায় নতুন ও বিদ্যমান উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ, আন্ডারগ্রাউন্ড ও ওভারহেড লাইন নির্মাণ, ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন এবং ডিজিটাল মনিটরিং ও ফল্ট লোকেটর প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। এর ফলে কারিগরি লোকসান (সিস্টেম লস) কমানোর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও উন্নত মানের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
আইটিএফসি থেকে ৩১০ কোটি ডলার
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত এবং নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখতে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩১০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি অনমনীয় ঋণ ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে এসসিএনসিএল।
এ ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ২৫০ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) এলএনজি আমদানির জন্য ৬০ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাস মেয়াদি এ ঋণের সুদের হার ধরা হয়েছে ছয় মাসের টার্ম এসওএফআরের সঙ্গে ১ দশমিক ৭০ শতাংশ যোগ করে, যা বিগত বছরের বার্ষিক হারের তুলনায় কিছুটা কম।
আইটিএফসি তাদের নিজস্ব উৎস থেকে সংস্থান করবে ৬০ কোটি ডলার। অবশিষ্ট ২৫০ কোটি ডলারের সংস্থান হবে কো-ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে। জরুরি ভিত্তিতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল অটুট রাখতে কমিটি নথিতে অনুমোদিত এ ঋণ প্রস্তাবের অনুমোদন নিশ্চিত করেছে।
ইআরডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনমনীয় ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসরণের বিষয়টি সভায় গুরুত্ব পায়। নিয়ম অনুযায়ী, বৈদেশিক অনমনীয় ঋণের দায় পরিশোধ ব্যয় কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের বেশি হবে না। সার্বিক অর্থনৈতিক বিবেচনা, নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই এ বিশাল অঙ্কের ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে।