
যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণের পর গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪০ ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য নতুন করে ৪০টি মামলা করেছে দেশটির বিচার বিভাগ। গত ৫ অক্টোবর এ উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অর্থপাচার, শিশুদের যৌন নির্যাতন, ভিসা জালিয়াতি ও কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এসব মামলা করা হয়েছে। আগস্টের শেষ দিক থেকে অক্টোবরের শুরুর সময়ের মধ্যে মামলাগুলো দায়ের করা হয়।
কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের পর এত অল্প সময়ে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য একসঙ্গে এতগুলো মামলা এর আগে হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চে এই উদ্যোগকে আধুনিক ইতিহাসে নাগরিকত্ব বাতিলের সবচেয়ে বড় কার্যক্রমের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সোমবার ঘোষিত মামলাগুলোর আসামিরা মেক্সিকো, পাকিস্তান, চীন ও সিয়েরা লিওনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় তারা নিজেদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য গোপন করেছিলেন।
বিচার বিভাগের তথ্যমতে, অধিকাংশ আসামির বিরুদ্ধে থাকা অপরাধের মামলায় সাজা হয়েছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর। তালিকাভুক্ত দুজনের বিরুদ্ধে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
সরকারের যুক্তি, এসব ব্যক্তি নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে অপরাধে জড়িত থাকায় তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ভালো নৈতিক চরিত্রের শর্ত পূরণ হয়নি। ফলে ওই সময় তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত ছিল না।
নাগরিকত্ব বাতিলের আইনের বিস্তৃতি
যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব বাতিলের আইন কয়েক দশক ধরে কার্যকর থাকলেও অতীতে সাধারণত গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেই এটি প্রয়োগ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধাপরাধ বা হলোকাস্টে জড়িত থাকার তথ্য গোপন করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
লিথুয়ানিয়ায় জন্ম নেওয়া নৈরাজ্যবাদী ও নারী অধিকারকর্মী এমা গোল্ডম্যানের বিরুদ্ধেও এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ১৯১৭ সালে যুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে কারাদণ্ড পাওয়ার পর তার নাগরিকত্ব বাতিল করে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠানো হয়।
তবে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন বড় ধরনের নির্বাসন কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়াও আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে, বিদেশে জন্ম নেওয়া কোনো ব্যক্তি নাগরিকত্বের আবেদন করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করলে, যা প্রকাশিত হলে তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হতেন, আদালতের মাধ্যমে তার নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করতে পারেন সরকারি কৌঁসুলিরা।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, নাগরিকত্ব বাতিলের পর কিছু মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়তে পারেন। সমালোচকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও এই ক্ষমতা ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন সোমালি-আমেরিকানদের একটি বড় অংশের নাগরিকত্ব বাতিলের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল। মিনেসোটায় সোমালি অভিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিশু দিবাযত্নকেন্দ্রে জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পর এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ট্রাম্পের দলীয় সহকর্মী প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির নাগরিকত্ব বাতিলের সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন। উগান্ডায় জন্ম নেওয়া মামদানির যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান নিয়েও ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছেন।মানচিত্র দেখুন
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের নাগরিকত্ব বাতিলের সম্ভাবনার কথাও এক পর্যায়ে বলেছিলেন ট্রাম্প। তবে পরে মাস্কের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের অবনতি ঘটার পর এমন বক্তব্য সামনে আসে।
এদিকে ট্রাম্প জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ব্যবস্থাও বাতিলের চেষ্টা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রায় সব শিশুই বর্তমানে জন্মসূত্রে দেশটির নাগরিকত্ব পায়। কূটনীতিকদের সন্তান ও বিদেশি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সন্তানসহ অল্প কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম রয়েছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। নাগরিকত্ব গ্রহণের মাধ্যমে পাওয়া নাগরিকত্বের মতো এটি বাতিল করার সুযোগ নেই। চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের লক্ষ্যে ট্রাম্পের উদ্যোগ খারিজ করে দেয়।
তবে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রয়োগ সীমিত করার লক্ষ্যে ট্রাম্পের দ্বিতীয় নির্বাহী আদেশকে ঘিরে দেশটিতে আইনি লড়াই এখনও চলমান রয়েছে।