
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি প্রকাশ্যে সড়কে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন গত শুক্রবার। মাত্র চার দিন পর, মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদ ‘নিরাপত্তার শঙ্কায়’ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেন। ঘটনাটা চমকে ওঠার মতো। মাসুদুজ্জামান এমন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন; চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ না থাকায় এবার তাঁর জন্য মাঠ প্রায় ফাঁকা। দেড় দশকেরও বেশি সময় বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। সে কারণে নেতাকর্মী-সমর্থকও দলটিকে ক্ষমতায় দেখতে উদগ্রীব। একেবারে শিউর শট; বলে পা ছোঁয়ালেই গোল। এ কারণে বহু আসনে মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই মারামারি চলছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে। এমন অবস্থায় কিনা মাসুদুজ্জামান মনোনয়ন পেয়েও ছেড়ে দিলেন!
মাসুদুজ্জামান বলেছেন, নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই পরিবারের সদস্যরা তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। ওসমান হাদির ওপর গুলির পর তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ কারণেই পরিবারের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে মাসুদের দল বিএনপির প্রভাব যথেষ্ট। ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকায় অভিজ্ঞতা বলে, প্রশাসন ও পুলিশের লোকদের নেকনজর বিএনপির প্রার্থীদেরই পাওয়ার কথা। জেলা চেম্বারের সাবেক সভাপতি হিসেবে সমাজ ও প্রশাসনে নিজস্ব প্রভাবও কম থাকার কথা নয়। তা সত্ত্বেও নিরাপত্তার শঙ্কায় নিজের দান এভাবে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা বিস্ময়কর বটে। তবে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে ভালো নয়– স্বীকার করতেই হবে। সারাদেশে খুন-খারাবি চলছেই। কিছুদিন আগে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, রাজধানীতে প্রতি মাসে ২০টি খুন হচ্ছে। সারাদেশের অবস্থা একই। রাস্তায় যেমন খুন হচ্ছ; ঘরের ভেতরেও গলা কেটে ফেলে যাচ্ছে খুনিরা। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব মাসুদুজ্জামানের মতো এমপি প্রার্থীও এড়াতে পারছেন না।
শুধু মাসুদুজ্জামান কেন; বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস একই ভীতির কথা বলেছেন। গত রোববার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ মুহূর্তের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচিত দলটিকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আমরা শুনলাম, আপনারা ৭০ জনের নাকি লিস্ট করেছেন যে হত্যা করবেন। প্রায়ই আমরা ফোন পাই। আমার বহু নেতাকর্মী ফোন পেয়েছে– সাবধান হয়ে যান’ (ইত্তেফাক অনলাইন)। একই সময়ে বিএনপির জোটসঙ্গী গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেছেন, খুনিদের তালিকায় তিনিসহ নাকি ৫০ সংসদ সদস্য প্রার্থী আছেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গত শনিবার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘স্ত্রী, সন্তান এবং ভাইবোন আমার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বিগ্ন। নির্বাচনের আগে তারা আমাকে আরও সতর্ক হতে বলেছেন, তারা ভীত। কিন্তু সত্যি বলতে আমি নই’ (সমকাল)।
সম্ভাব্য প্রার্থী এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি লোকদের আশ্বস্ত করতে সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। কিন্তু একই দিনে জারি করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপন আতঙ্কের আগুনে বরং ঘি ঢেলেছে। বিবিসির খবর, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের নিরাপত্তায় তাদের নামে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং দেহরক্ষী নিয়োগে নীতিমালা জারি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর ফলে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করতে পারবেন। প্রজ্ঞাপন দেখে সোমবারই বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনকারী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রার্থীদের হাতে বন্দুক বা বন্দুকের লাইসেন্স দিলে ‘আফ্রিকান সিনড্রোম’ বা আফ্রিকার মতো সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন (আজকের পত্রিকা)।
সত্যিই, যেখানে অতীতে প্রায় সব নির্বাচনের সময় একদিকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলত, আরেকদিকে বৈধ অস্ত্রও থানায় জমা নেওয়া হতো; সেখানে এবার প্রার্থীদের সশস্ত্র করার আয়োজন চলছে। যে নির্বাচন এ দেশে একসময় ছিল গণতন্ত্রের উৎসব, তা এমন পরিস্থিতিতে কী রূপ নিতে পারে, ভাবলেও গা শিউরে ওঠে বৈ কি!
এখানে অবধারিতভাবেই বিশেষত বিগত সরকারের কথা উঠতে পারে। বলা হতে পারে, নির্বাচন ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এ ভয়ংকর পরিস্থিতির উদ্ভব। কিন্তু সেই অপশাসন পেছনে ফেলে সুশাসনের পথে যাত্রা করতেই তো গত বছর গণঅভ্যুত্থান হলো। গণঅভ্যুত্থান মানেই রাষ্ট্র ও সমাজে যা কিছু নেতিবাচক তার বিপরীতে ইতিবাচকতার প্রবল উত্থান। এর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজে কাঙ্ক্ষিত পরিবতর্নগুলো আনা হয়। অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠাও তার অংশ।
এ দেশে গণঅভ্যুত্থান এবারই প্রথম হয়নি; আগে অন্তত আরও দুবার হয়েছে– ১৯৬৯ ও ১৯৯০ সালে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তো এক সামরিক শাসক বিদায় নিয়ে আরেক সামরিক শাসক ক্ষমতায় বসেছিল। তারই অধীনে ১৯৭০ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এ ভূখণ্ডের জনগণ ঔপনিবেশিক পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বার্তা দিয়েছিল। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও দেশের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা রাষ্ট্রকে দীর্ঘ বিরতির পর গণতন্ত্রের ধারায় ফিরিয়ে আনে। নজিরবিহীনভাবে সব দল ও মতের সমর্থনে চালু হয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি। এবার নির্বাচন ঘিরে জনগণের সে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে না কেন?
একটি বিষয় তো স্পষ্ট, গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের আগে বিরোধী সব দল ও শক্তির অভিন্ন দাবি ছিল আওয়ামী লীগের পতন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসার পর থেকেই দলগুলোর দাবির যেন শেষ নেই। বিএনপি ও মিত্ররা যখন দ্রুত নির্বাচন চেয়েছে তখন জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও মিত্ররা বলেছে, কেবল নির্বাচনের জন্য গণঅভ্যুত্থান হয়নি। সাধারণ নির্বাচনের সময় যখন ঠিক হলো তখন বলা হলো, আগে সংস্কার করতে হবে। সে জন্য সংস্কারের ফর্দ সম্পর্কে জনগণের অনুমোদন নিতে গণভোট করে তবেই নির্বাচনে যেতে হবে। এ পরিস্থিতিতে গত ১২ ডিসেম্বর তপশিল ঘোষণার আগেও জনমনে এ সংশয় কাজ করেছে– নির্বাচনটি আদৌ ফেব্রুয়ারিতে হবে কিনা।
দ্বিতীয়ত, শপথ গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা নিজে জানিয়েছিলেন, তাঁর সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু গত ১৬ মাসে মনে হয়নি, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সরকার আদৌ ভাবিত। বরং একাধিকবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দূরের কথা; উন্নতি ঘটেছে!
অন্যদিকে পুলিশ বাহিনী গত বছরের আগস্টের ধাক্কা এখনও সামলে উঠতে পারেনি। বিশেষত মব সহিংসতার প্রতি সরকারের মনোভাব দেখে পুলিশ কাকে ধরবে কাকে ছাড়বে বুঝে উঠতে না পেরে গুরুতর অপরাধ ঠেকানোর প্রশ্নেও নীরব থাকাই বুদ্ধির পরিচায়ক মনে করেছে। মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত সেনাসদস্যরাও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা খুব কম ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করছেন। এ এমন এক অবস্থা যেখানে ঘরপোড়া আগুনে আলু পুড়িয়ে খেতে চাওয়াদেরই পোয়াবারো। যখন যে কাজ করার দরকার ছিল তা না করে প্রার্থীদের সশস্ত্র করার তুঘলকি পদক্ষেপ দিয়ে কি সে ঘাটতি পূরণ করা যাবে?
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
সূত্র: সমকাল