প্রত্যাশার নতুন আলোয় ২০২৬

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অবঃ)
ডেস্ক রিপোর্ট
  ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:০১

নতুন দিনের আভায় পুবের আকাশে উদিত হয়েছে নতুন সূর্য। কুয়াশার চাদর ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছে তার আলো। আজকের সূর্যোদয় নিয়ে এসেছে নুতন বারতা। বিগত দিনের সব ভুল, হতাশা, দুঃখ, গ্লানি মুছে দিয়ে আজ শুরু হবে নতুন উদ্যমে সফলতার পানে এগিয়ে চলা। গত ৩০ ডিসেম্বর, লক্ষ কোটি বাংলাদেশীকে কাঁদিয়ে জীবনের ওপারে চলে গেলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজা পরিণত হয়েছিল জনতার মহা সমুদ্রে। তার মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের আবহ। ভোরের শিশিরগুলো যেন বাংলার প্রকৃতির শোকের উচ্চারণ।

নতুন বছরের শুভেচ্ছা
আজ ২০২৬ সালের প্রথম দিন। সবাইকে খৃষ্টীয় নতুন বছরের শুভেচ্ছা। নতুন বছরটি সবার আনন্দে ও শান্তিতে ভরে উঠুক। নতুন বছর মানেই নতুন প্রত্যাশা। উদ্যম আর সাহস নিয়ে আবার পথচলার শুরু।

গভীর সন্ধিক্ষনের সময়
যুগপৎ অনিশ্চয়তা ও আশাবাদের দোলাচল নিয়েই নতুন একটি বছরের যাত্রা শুরু হলো। নতুন বছর মানেই নতুন প্রত্যাশা, নতুন স্বপ্ন ও নতুন প্রতিশ্রুতি। ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি ক্যালেন্ডারের বছর নয়। এটি এক গভীর সন্ধিক্ষণের সময়। রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক সংহতি ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দেশের নাগরিকরা একটি স্থিতিশীল, ন্যায্যতাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের প্রত্যাশায় নতুন বছরকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ। এই বছরটি শুধু ক্ষমতা ও বিরোধিতার দ্বন্দ্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং রাজনৈতিক সংস্কার, জাতীয় ঐক্যে অনুসন্ধান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নতুন বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্খা
২০২৪ এর জুলাই-আগষ্ট মাসের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পর দেশের মানুষ নতুন করে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখছে। এই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশাবাদ জেগেছে।
ছাত্র-জনতার স্বপ্নের ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর কথা এখন বহুল আলোচিত। এই নতুন বাংলাদেশ হবে- বহুত্ববাদী, উদার, ইনসাফময়, সুশাসিত, শোষণহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার, দুর্নীতি ও উগ্রপন্থার কোন স্থান থাকবে না। আইনের শাসন, সুশাসন, সরকার ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও মুক্ত-গণমাধ্যম জনগণের পরম আরাধ্য বিষয়। এখানে থাকবে ইসলামসহ সকল ধর্মের প্রতি গভীর সম্মান।
বাংলাদেশের প্রায় ৯১% মানুষ মুসলমান। ৯৯% মানুষ বাঙালি। একই সঙ্গে রয়েছে প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ হয়ে উঠুক এই সকল মানুষের আকাঙ্খা, সকল ধারার স্রোতের, মতের ও ঐতিহ্যের অপরূপ এক সম্মিলনী। নানা বর্ণের অপরূপ ফুলের বাগান। এই মহাযাত্রায় কেউ যেন বাইরে না থাকে।

জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার উদ্যোগ
২০২৫ সালের আলোচিত বিষয় ছিল জুলাই সনদ ও এর বাস্তবায়ন। ২০২৫ সালের ৫ আগষ্ট তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে “জুলাই ঘোষণা পত্র” প্রকাশ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন এবং বাংলাদেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে “জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫” স্বাক্ষর করেন। এই সনদে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত বিভিন্ন অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গত ১২ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদে “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫” অনুমোদন করা হয়। রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারী করেন। জাতীয় নির্বাচনের দিনেই জুলাই সনদ ইস্যুতে গণভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২৫ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম চলছে এবং একটি মামলার রায়ও হয়েছে।

জন আকাঙ্খার বিপরিত যাত্রা-মব সহিংসতা
দুঃখজনকভাবে জন আকাঙ্খার বিপরিত যাত্রা এ বছরে দেখা গেছে। ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের কারণে সংখ্যালঘু কিছু মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বেশ কিছু মাজার মন্দির ও কিছু শিল্পকর্ম আক্রান্ত হয়েছে। জোর-জবরদস্তি, ট্যাগিং, মব ভায়োলেন্স ও নারী বিদ্বেষী তৎপরতা দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মাত্রায়। কিছু উগ্র পন্থার তৎপরতা আছে। চাঁদাবাজি আবার শুরু হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এখনও রোধ করা যায়নি। এতে মানুষের হতাশা বাড়ছে। জুলাই বিপ্লব নিয়ে লেখা দেয়ালের গ্রাফিতিগুলো ম্লান হয়ে গেছে।
বিশেষত গত ১৮ ডিসেম্বর তারিখে, প্রথমে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এ এবং পরে ছায়ানট ও উদীচীতে যে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান, বাসভবন ও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং সহিংস উন্মাদনা ছড়ানো হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর তারিখে ভালুকায় শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে নির্মমভাবে পিটিয়ে আগুনে পুড়িয়ে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়ার মত জঘন্য ঘটনা ঘটেছে।

নাগরিকদের যত উদ্বেগ
বিগত বছর জুড়ে নাগরিকদের প্রধান উদ্বেগ ছিল, নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। মব সহিসংসতা, চাঁদাবজি, চুরি-ডাকাতি, লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বিরাজ করছে। মাজারে হামলা, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ, নারী ও সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা বন্ধে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অনেকে মনে করেন। এক্ষেত্রে সরকারের নিক্রীয়তা সমালোচিত হয়েছে।

স্বৈরাচার পতনের পর চ্যালেঞ্জ – সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ
স্বৈরাচারের পতন হলেই গণতন্ত্রের বিজয় হয় না। বরং গণতন্ত্রের পরীক্ষার শুরু। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, স্বৈরশাসনের অবসান স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি, ন্যায়বিচার বা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এনে দেয় না। বরং এটি নাগরিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একটি সুযোগ দেয়-যেখানে সঠিক সিদ্ধান্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে, আর ভুল সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকে ঠেলে দিতে পারে বিশৃঙ্খলা, প্রতিশোধপরায়ণতা বা নতুন কর্তৃত্ববাদে। এ কারণেই স্বৈরাচারের পতন পরবর্তী অধ্যায়কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন- “চরম বিপজ্জনক ক্রান্তিকাল”। আমরা এখন এমনই বিপজ্জনক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
স্বৈরাচার পতনের পর গণতন্ত্রের পথে উত্তরণকালে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। এক্ষেত্রে জাতীয় নেতৃত্ব সংযমী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন না হলে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা, নতুন এক স্বৈরতন্ত্রের উত্থানের বিপদ। তাই নেতৃত্বকে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, সহনশীলতার মাধ্যমে মারাত্মক বিপজ্জনক ক্রান্তিকাল পাড়ি দিতে হয়। আরব বসন্ত, লিবিয়া, মিসর বা এমনকি কিছু লাতিন আমেরিকান রাষ্ট্র তার বাস্তব উদাহরণ।

জাতীয় ঐক্য বনাম-গৃহযুদ্ধের বিষন্ন আলোচনা
জুলাই বিপ্লব বা বর্ষা বিপ্লব এর পর গত ১৫ মাস বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কিছু ‍কিছু ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্য ভেঙে গেছে। মব ভায়োলেন্স, ট্যাগিং, বিভাজন সৃষ্টি, নৈরাজ্য ও অরাজকতা, উগ্রপন্থিদের কার্যক্রম ও পরাজিত ফ্যাসিবাদিদের চোখ রাঙানি মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।
কোন কোন শক্তি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের মানুষের চিন্তার স্ট্রাকচার ভেঙে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। এখন যে কোন মুহূর্তে মব ডেকে এই রাষ্ট্রকে অচল করে দেওয়া যাবে...। এমন চিন্তা অনেক মানুষ করছে। এধনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতমুখর দেশে পরিণত হতে পারে। এটা একটা নিষ্ঠুর সত্য যে, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর গৃহযুদ্ধের মত বিষয় নিয়ে বিশেষত সোস্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। এ থেকে বাঁচতে হলে আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। নাগরিকদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। লক্ষ প্রানের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি। এই বাংলাদেশে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতমূখর পরিস্থিতি মোটেই কাম্য নয়।

জনতুষ্টিবাদের জোয়ার থেকে সাবধাণতা
সারা পৃথিবীতে জনতুষ্টিবাদীর রাজনীতির জয়জয়াকার চলছে। এদের অনেকেই পপুলিষ্ট ও ডেমাগগ রাজনৈতিক নেতারা মানুষের রাগ ক্ষোভ, বিদ্বেষ, বিভেদ ক্রমাগত উসকে দেওয়ার জন্য ত্রুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করছেন। বৈশ্বিক এই প্রবনতা এসে হাজির হয়েছে বাংলাদেশেও। তার ওপর দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারি শাসনের অধীনে থেকে আমাদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা একেবারে তলানিতে। এ কারনে আমাদের ঝুঁকি অনেক বেশী।
স্বৈরাচারের পতন হলেই গণতন্ত্র ফেরে না। স্বৈরাচারের পতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তি এনে দেয় না। বরং এটি নাগরিকদের মুক্তির সুযোগ দেয় মাত্র। স্বেরাচারের পতনের পর সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা এবং সামাজিক নৈরাজ্যের মধ্য দিয়েই ফ্যাসিবাদের মতো উগ্র মতাদর্শের চোরাপথ নতুনভাবে তৈরি হতে পারে। আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

জাতীয় নির্বাচন ২০২৬
বাংলাদেশের মব সহিংসাত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিভেদের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল নাগরিকদের মধ্যে গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রশ্নে আশাবাদ তৈরী করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের জোয়াল ভেঙে দেশকে গণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যাওয়ার যে বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই হবে অন্তবর্তী সরকার ও নির্বাচন করিশনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ। নতুন বছরে দেশবাসী একটি নিরাপদ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশের প্রত্যাশা করেন।

নির্বাচন পরবর্তী প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
বর্তমান পটভূমিতে নির্বাচন পরবর্তী সরকারের জন্য একটা বড় কাজ হলো অর্থনীতিকে দাঁড় করানো। সার্বিক অরাজকতা হতে বেরিয়ে অর্থনীতিতে শৃংখলা নিয়ে আসা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমাজ ও রাষ্ট্রে সহিষ্ণুতা ফিরিয়ে আনা। বিগত ১৭ বছরের দুঃশাসন এবং তার পতনের পর যে শুন্যতা তৈরি হয়েছে, সে কারনে বাংলাদেশে চুড়ান্ত রকমের অসহিষ্ণুতা গড়ে উঠেছে। নতুন সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব হবে সষ্ণিতুতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। অতীতের ধারায় প্রতিশোধ নয় বরং বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

এক জন হাদি ও ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’
বছরের শেষে এসে (১২ ডিসেম্বর) “ইনকিলাব মঞ্চের” মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে নৃশংসভাবে দিনের আলোতে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হয় ঢাকার রাজপথে। এই ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেয়। হাদিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে ঢাকা, পরে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নেয়া হলেও বাঁচানো যায়নি। তার জানাজায় লক্ষ লক্ষ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। তরুণ হাদির স্বপ্ন/আদর্শ ছিল ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’। তরুণ হাদি তার স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তারুন্যের মধ্যে। ভবিষ্যতে রাজনীতিবীদদের এই বিষয়টি মনে রাখতে হবে।

উই হ্যাভ আ প্ল্যান
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যের লন্ডনে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেন। ঐদিন পূর্বাচলে লাখ লাখ মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন “উই হ্যাভ আ প্ল্যান। উই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দি পিপল, ফর দি কান্ট্রি।” আশা করি, তারেক রহমান এর দেশে ফেরার ঘটনা নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

বাইরে থেকে আসা যত চ্যালেঞ্জ
শুধু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ নয়, ২০২৬ সালের বড় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বাইরে থেকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ভারতের মিডিয়া ও রাজনীতিবিদদের একাংশ থেকে বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রম চলছে। অন্তত পক্ষে এক ধরনের ‘ইনফরমেশন ওয়ার’ চলছে। গত বেশ কিছুদিনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তেজনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদেরকে ভারতের আধিপত্যবাদী কার্যক্রম থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
এদিকে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে আরাকান আর্মি রাখাইনের প্রায় ৯০% অঞ্চল দখল করেছে। বলতে গেলে বাংলাদেশের এক নতুন প্রতিবেশী তৈরি হয়েছে। বর্তমানে রাখাইন অঞ্চলে ৪টি সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠি সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে রাখাইন অঞ্চলে ত্রিমুখী সংঘর্ষ/যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ বিষয়ে আমাদের করণীয় নতুনভাবে ভাবতে হবে।

প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে অবশ্যই ডেটারেন্স অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্তকরণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীকেও একটি পক্ষ বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের বিতর্ক ও সমালোচনা গ্রহণযোগ্য নয়। সশস্ত্র বাহিনী ও সিকিউরিটি সেক্টরের সংস্কারে গুরুত্ব দেয়া জরুরী। জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্য এদুটি বিষয়েই দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সুন্দর দিনের প্রত্যাশা
২০২৬ নিয়ে আমাদের অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন। কিছু শঙ্কাও রয়েছে। তবু আশাই তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। তুরস্কের বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমত লিখেছেন।

‘যে সমুদ্র সবচেয়ে সুন্দর

আমরা আজও তা দেখিনি।

আমাদের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো

আজও আমরা পাইনি...।’

২০২৬ সাল আমাদের জীবনে প্রার্থিত সুন্দর দিন বয়ে আনুক। এখন ঐক্যের সময়। বিভাজন, বিদ্বেষ নয়। বাচতে হলে আমাদের এক থাকতে হবে। আমাদের অনুপ্রাণিত করুক ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও কল্যাণকামিতা। ২০২৬ সাল আমাদের জীবনে প্রার্থিত সুন্দর দিনগুলো বয়ে আনুক। সব প্রতিকূলতা, চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে, বাধা পেরিয়ে নতুন এই বছরে এগিয়ে যাক আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রাণের বাংলাদেশ। সবাইকে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের প্রাণঢালা ‍শুভেচ্ছা।


মো. বায়েজিদ সরোয়ার: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক