ইনক্লুসিভ  বা অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনীতি ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিত   

 আবদূন নূর 
ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০৭


বর্তমানে সারা বিশ্বে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির চর্চা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে  সর্বত্র আলোচনা চলছে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব ।
ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, দল বা সামাজিক শ্রেণি নির্বিশেষে সমাজের সব মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, মতামত এবং নীত নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। এতে কোনো প্রান্তিক বা সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বাদ পড়ে না।মূল বৈশিষ্ট্যসবার অংশগ্রহণ: ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে বা নির্বাচনে শুধু একটি নির্দিষ্ট প্রভাবশালী গোষ্ঠী নয়, সব স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকে।ভিন্নমতের সম্মান: বিরোধীদের বা ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের কথা শোনার ও মূল্যায়ন করার মানসিকতা থাকে।
 এটি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের পরিপূরক । জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা শারীরিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কোনো নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় না।
 এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিত নিশ্চিত করা হয় । সব অংশীজনের অংশগ্রহণ থাকায় সরকারের সিদ্ধান্তগুলো বেশি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ হয়।কেন এটি জরুরি?সামাজিক ঐক্য ও শান্তি বজায় রাখে।গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করে।রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত হয়।
ইতিহাসে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ রাজনীতির বেশ কিছু বিখ্যাত উদাহরণ রয়েছে। যখনই কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র চরম বৈষম্য বা সংঘাত থেকে বের হয়ে সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করেছে, তখনই তা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক উদাহরণ দিলাম । 
নেলসন ম্যান্ডেলা ও বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকা (১৯৯৪)দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়েক দশক ধরে চলা শ্বেতাঙ্গদের চরম বৈষম্যমূলক 'বর্ণবাদ' শাসনের অবসান ঘটে ১৯৯৪ সালে।
পরবর্তীতে ইনক্লুসিভ উদ্যোগ গ্রহণ করে ক্ষমতায় এসে নেলসন ম্যান্ডেলা শ্বেতাঙ্গদের প্রতি প্রতিশোধ না নিয়ে একটি 'রেনবো নেশন' (Rainbow Nation)বা রংধনু জাতি গঠনের ডাক দেন। এর ফলে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ, শ্বেতাঙ্গ ও অন্যান্য সব নৃগোষ্ঠীকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ও সংবিধান তৈরি করেন, যেখানে সবার রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার সমান করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার আন্দোলন (১৯৫০-১৯৬০ এর দশক)বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান-আমেরিকান বা কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের ভোটাধিকার এবং পাবলিক স্থানে যাতায়াতের সমান অধিকার ছিল না।মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এবং অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের তীব্র অহিংস আন্দোলনের মুখে মার্কিন সরকার ১৯৬৪ সালে 'সিভিল রাইটস অ্যাক্ট' (Civil Rights Act) এবং ১৯৬৫ সালে 'ভোটিং রাইটস অ্যাক্ট' পাস করতে বাধ্য হয়। যার ফলশ্রুতিতে এর মাধ্যমে আইনিভাবে বর্ণবৈষম্য নিষিদ্ধ হয় এবং কৃষ্ণাঙ্গদের মূলধারার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথ সুগম হয়।

প্রাচীন এথেন্সের গণতন্ত্র (খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দী)যদিও আধুনিক মানদণ্ডে এটি সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না (কারণ নারী ও দাসদের অধিকার ছিল না), তবুও তৎকালীন রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের যুগে এটি ছিল এক বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। অন্তর্বর্তী উদ্যোগের কারণে এথেন্সে 'ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি' বা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র চালু করা হয়। যার ফলে  যেকোনো সাধারণ পুরুষ নাগরিক (ধনী কিংবা দরিদ্র নির্বিশেষে) সরাসরি এসে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভোট প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারতেন। এটি সাধারণ মানুষকে ক্ষমতার অংশীদার করার প্রাথমিক ঐতিহাসিক ভিত্তি।

নিউজিল্যান্ডের 'ওয়েটাঙ্গি ট্রাইব্যুনাল' (১৯৭৫)নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী 'মাওরি' (Māori) জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ব্রিটিশ উপনিবেশের কারণে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল。ইনক্লুসিভ উদ্যোগ: ১৯৭৫ সালে নিউজিল্যান্ড সরকার ওয়েটাঙ্গি ট্রাইব্যুনাল (Waitangi Tribunal) গঠন করে।ফলাফল: এর মাধ্যমে আদিবাসীদের ক্ষোভ ও অধিকারের বিষয়গুলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের সংসদে মাওরিদের জন্য আসন সংরক্ষিত থাকে এবং তারা দেশের মূলধারার রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয়।

ইসলামের ইতিহাসে মদিনা সনদ (৬২২ খ্রিস্টাব্দ) এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের একটি প্রাচীন ও অনন্য দলিল।
যার কারণে ইনক্লুসিভ উদ্যোগের মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য গোত্রের মধ্যে শান্তি ও সহাবস্থান বজায় রাখতে এই লিখিত চুক্তি করেন।যার ফলশ্রুতিতে মদিনা সনদে সব ধর্মের মানুষকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেওয়া হয় এবং মদিনা রাষ্ট্র রক্ষায় সবাইকে সমান নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের অংশীদার ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ রাজনীতির বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ঐতিহাসিক প্রয়োগ রয়েছে। বহুমাত্রিক জাতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতির এই অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে এবং অধিকার আদায়ে বিভিন্ন সময়ে এই নীতি ব্যবহার করা হয়েছে।  প্রধান কয়েকটি উদাহরণ আলোচনা করা হলো:
সম্রাট অশোকের শাসন নীতি (খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক — প্রাচীন ভারত)প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ মৌর্য সম্রাট অশোক।
তিনি ইনক্লুসিভ উদ্যোগের গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন । কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অশোক যুদ্ধ নীতি ত্যাগ করেন এবং 'ধম্ম' (Dhamma) বা নৈতিক জীবনধারা প্রচার শুরু করেন। 

তিনি তার বিশাল সাম্রাজ্যে বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও মতাবলম্বী মানুষের মধ্যে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন। তার শিলালিপিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, রাজা সব প্রজাকে নিজের সন্তানের মতো দেখেন এবং সবার কল্যাণ নিশ্চিত করাই তার ধর্ম।

মোগল সম্রাট আকবরের 'দ্বীন-ই-ইলাহী' ও 'সুলাহ-ই-কুল' (১৬শ শতক — মোঘল ভারত)মোঘল সাম্রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু এবং সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সম্রাট আকবর অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেন।

তিনি 'সুলাহ-ই-কুল' (Universal Peace বা সবার জন্য শান্তি) নীতি এবং ধর্মীয় সমন্বয়বাদী 'দ্বীন-ই-ইলাহী'র প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর অমুসলিমদের ওপর থেকে বৈষম্যমূলক 'জিজিয়া কর' তুলে নেন। একই সাথে রাজপুতসহ হিন্দু নেতাদের সাম্রাজ্যের উচ্চ রাজনৈতিক ও সামরিক পদে (যেমন: রাজা মানসিংহ, বীরবল) অন্তর্ভুক্ত করেন, যা মোঘল শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করেছিল।
সদ‍্য স্বাধীন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence)বাংলাদেশের জন্মই হয়েছিল একটি চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা (পাকিস্তান) থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।

 এখানে ইনক্লুসিভ উদ্যোগ  গ্রহন করে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হিসেবে তিনটি নীতি ঘোষণা করা হয়: সাম্য (Equality), মানবিক মর্যাদা (Human Dignity) ও সামাজিক ন্যায়বিচার (Social Justice)।

পাকিস্তান আমলে বাঙালিরা যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে তা দূর করে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকারের অঙ্গীকার করা হয়, যা ১৯৭২ সালের সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়েছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি (১৯৯৭ — বাংলাদেশ)বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে (পার্বত্য চট্টগ্রাম) নৃগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সশস্ত্র লড়াই করছিল।

এখানে ইনক্লুসিভ উদ্যোগের মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ি আদিবাসীদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভূমির অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গঠন করা হয় 'পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ', যার ফলে মূলধারার রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও উন্নয়নে এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার আইনি পথ তৈরি হয়।

ভারতের সংবিধানে দলিত ও অনগ্রসরদের জন্য কোটা ব্যবস্থা (১৯৫০)দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ ব্যবস্থায় কাস্ট বা জাতিভেদ প্রথা (Caste System) ছিল এক বিশাল বৈষম্যের নাম, যেখানে নিম্নবর্ণের মানুষ বা দলিতরা রাজনীতি ও শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

ভারতের সংবিধান প্রণেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর (যিনি নিজে একজন দলিত ছিলেন) সংবিধানে অনগ্রসরদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখেন।

সংবিধানে তফসিলি জাতি (SC) এবং তফসিলি উপজাতিদের (ST) জন্য সংসদ, সরকারি চাকরি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসন বা কোটা সংরক্ষিত করা হয়। এর ফলে ভারতের রাজনীতিতে একসময়কার চরম নির্যাতিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ক্ষমতার মূলধারায় উঠে আসতে সক্ষম হয়।

নেপালের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (২০০৬-২০১৫)নেপাল দীর্ঘকাল ধরে একটি হিন্দু রাজতান্ত্রিক দেশ ছিল, যেখানে নির্দিষ্ট কিছু জাতি ও রাজপরিবারের মানুষই ক্ষমতা ভোগ করত।

২০০৬ সালের গণ-আন্দোলন এবং মাওবাদী গৃহযুদ্ধের অবসানের পর নেপাল রাজতন্ত্র থেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ফেডারেল প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।

২০১৫ সালের নতুন সংবিধানে নেপাল পার্লামেন্টে সমানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থা (Proportional Representation) চালু করে। এর মাধ্যমে রাজনীতিতে মদেশী, আদিবাসী, দলিত এবং নারীদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কার।দক্ষিণ এশিয়ার এই ইতিহাসগুলো দেখায় যে, যখনই কোনো রাষ্ট্র তার বৈচিত্র্যকে মেনে নিয়ে সবাইকে রাজনীতিতে জায়গা দিয়েছে, তখনই সেখানে স্থায়িত্ব এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বিকল্প কোনো রাজনীতি কার্যকর নয় বলে অনেকেই মতামত ব্যক্ত করেছেন ।

লেখক: কবি ও রাজনীতিবিদ 
নিউইয়র্ক ৭ জুলাই ২০২৬