ক্যান্সার

চিকিৎসা বিলম্বে অর্থ ও জীবন ক্ষয়

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ১৩:০৪

সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলের রাহেলা খাতুন (৫২) গত বছর সেপ্টেম্বরে জানতে পারেন তাঁর মুখগহ্বরে ক্যান্সার। উন্নত চিকিৎসার জন্য স্বজনরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। তবে শরীরের অন্যান্য সমস্যা ও ক্যান্সারের পর্যায় নিশ্চিত করতে সময় লাগে প্রায় ছয় মাস।
চিকিৎসা বিলম্বে অর্থ ও জীবন ক্ষয়চলতি বছরের মার্চে চিকিৎসকরা জানান, রাহেলার জরুরি রেডিওথেরাপি প্রয়োজন। এরপর আবার দুঃসহ অপেক্ষার পালা। রেডিওথেরাপির জন্য নিবন্ধন থেকে শুরু করে পরিকল্পনা প্রণয়ন পর্যন্ত কেটে যায় দীর্ঘ আট মাস।
এই দীর্ঘসূত্রতা রাহেলার শারীরিক অবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।
ক্যান্সারের ক্ষত এতটাই জটিল হয়ে উঠেছে যে রাহেলা এখন আর কথা বলতে পারেন না। ঠিকমতো খাবার খেতেও পারেন না। তীব্র ব্যথায় মাঝেমধ্যে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেডিওথেরাপির কক্ষের সামনে রাহেলার পরিবারের সদস্য সজিবের সঙ্গে কথা হয়।
তিনি জানান, চিকিৎসার বিপুল ব্যয় সামলাতে গিয়ে তাঁরা গবাদি পশু ও বাড়ির ভিটা বিক্রি করেছেন। এখন শুধু চিকিৎসাই নয়, দুই বেলা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা নিয়ে পরিবারটি পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মুখে। তাঁরা একদিকে যেমন চিকিৎসা চালিয়ে  যেতে পারছেন না, তেমনি চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখে ফিরেও যেতে পারছেন না।
রাহেলা খাতুনের এই দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু একজন রোগীর কষ্টের গল্প নয়; বরং দেশের ক্যান্সার চিকিৎসাব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, সংকট এবং সাধারণ মানুষের বঞ্চনার চিত্র।
দেশের ক্যান্সার চিকিৎসায় এমন দুর্ভোগের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক দশকে ক্যান্সার রোগী বেড়েছে অন্তত ১০ গুণ।
কিন্তু এই সময়ে হাসপাতাল তৈরি ও শয্যা বাড়ানোর বাইরে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ, মেশিন ও যন্ত্রপাতি বসানো—কোনোটাই হয়নি। এতে রোগটির চিকিৎসাব্যবস্থায় এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এতে চিকিৎসাবৈষম্য বেড়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র রোগীরা অর্থ ও জীবন দুটিই যাচ্ছে।
সরকারি হাসপাতালে রেডিও থেরাপি পেতে গড়ে চার মাস দেরি : দেশের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের সংগঠন ‘অনকোলজি ক্লাব বাংলাদেশ’-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে রেডিও থেরাপি পেতে গড়ে প্রায় চার মাস সময় লাগে। সর্বোচ্চ ছয় মাস সময় লাগে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে। সাভারে এনার্জি কমিশন, যেখানে যাতায়াতব্যবস্থার জটিলতার কারণে সহজে কোনো রোগী যায় না, সেখানে এখন দুই মাস অপেক্ষা করতে হয়। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে গড়ে ২৩ দিন সময় লাগে। বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় লাগছে আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালে। এখানে গড়ে একজন রোগীকে চার মাস অপেক্ষা করতে হয়।
জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক ড. মো. জাহাঙ্গীর কবির  বলেন, ২০২৪ সালে ক্যান্সার হাসপাতালে নতুন-পুরনো মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ ৮৫ হাজার রোগীকে বহির্বিভাগে সেবা দেওয়া হয়েছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় আমরা কেমোথেরাপি এবং সার্জারি করতে পারি। কিন্তু ক্যান্সার রোগীর রেডিওথেরাপির যে চাহিদা, সে অনুযায়ী সেবা দিতে পারছি না।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দেশে ক্যান্সার আক্রান্তদের রেডিওথেরাপি দেওয়া হয় মূলত দুই ধরনের মেশিনে। একটি কোবাল্ট, অন্যটি লিনিয়ার। সরকারি হাসপাতালে নতুন কোবাল্ট মেশিনে দিনে গড়ে ২০০ জন রোগীকে থেরাপি দেওয়া যায়। লিনিয়ার মেশিনে দিনে থেরাপি দেওয়া যায় অন্তত ১০০ জনকে। সরকারি হাসপাতালে কোবাল্ট মেশিনে রেডিওথেরাপিতে জনপ্রতি খরচ ১০০ টাকা। এর সঙ্গে জনপ্রতি প্ল্যানিং খরচ এক হাজার ৫০০ টাকা। লিনিয়ার মেশিনে খরচ ২০০ টাকা। এর সঙ্গে প্ল্যানিং খরচ এক হাজার ৫০০ টাকা।
অন্যদিকে একটি বেসরকারি ক্যান্সার হাসপাতালে লিনিয়ার মেশিনে বর্তমানে জনপ্রতি রেডিওথেরাপির খরচ সাড়ে চার হাজার থেকে আট হাজার টাকা। এর সঙ্গে প্ল্যানিং খরচ ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা।
৩৮ ধরনের ক্যান্সার ভুগছে মানুষ : দেশে জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সারের কোনো তথ্য বা পরিসংখ্যান নেই। কত মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত, কোন ক্যান্সারে কত মানুষ বেশি ভুগছেন তা তা বলা হয়েছে অনুমিত হিসাব থেকে। সম্প্রতি দেশের এক এলাকায় জনসংখ্যাভিত্তিক ক্যান্সার নিবন্ধনে কাজ করেছেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকরা।
এতে দেখা গেছে, ৩৮ ধরনের ক্যান্সারে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে আক্রান্ত ১০৬ জন। ক্যান্সার রোগীদের ৯৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৭৫ বছরের মধ্যে।
নিবন্ধনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পুরুষদের মধ্যে পাঁচটি ক্যান্সার বেশি। এর মধ্যে আছে স্বরযন্ত্র (১৩ শতাংশ), পাকস্থলী (১০.৪ শতাংশ), ফুসফুস (৮.৭ শতাংশ), ঠোঁট ও মুখগহ্বর (৭ শতাংশ) এবং খাদ্যনালির (৬.১ শতাংশ)।
নারীদের প্রধান পাঁচটি ক্যান্সারের মধ্যে আছে স্তন (৩৬,৪ শতাংশ), জরায়ুমুখ (১১.১ শতাংশ), ঠোঁট ও মুখগহ্বর (১০.১ শতাংশ), থাইরয়েড (৭.১ শতাংশ) ও ডিম্বাশয়ের (৫.১ শতাংশ) ক্যান্সার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমিত হিসাব অনুযায়ী (২০২২ সালের প্রতিবেদন), বাংলাদেশে প্রতিবছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এক লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন। মৃত্যু এক লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জনের।

মেশিন আছে কত, প্রয়োজন কত : বাংলাদেশের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের সংগঠন মেডিক্যাল অনকোলজি সোসাইটি ইন বাংলাদেশের (এমওএসবি) তথ্য মতে, অর্ধেকের বেশি ক্যান্সার রোগীদের রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। এসব রোগী সঠিক সময়ে চিকিৎসা দিতে অন্তত ২০৯ প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মেশিন রয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ১৮টি, অচল ১২টি।
সংগঠনের দেওয়া তথ্য মতে, ঢাকা মহানগরে ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় অন্তত ১৪টি রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন। বর্তমানে আছে ২১টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে থাকা আটটি মেশিনের ছয়টি নষ্ট। বেসরকারি হাসপাতালের ১৩টি মেশিন সচল। 
মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগে থাকা রোগীদের চিকিৎসায় অন্তত ৪২টি রেডিওথেরাপি মেশিন দরকার। বর্তমানে একটিও নেই। একই অবস্থা খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে। এসব বিভাগে কখনো মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরিশাল বিভাগে রেডিও ১২টি ও রংপুরে ১৬টি রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন। ময়মনসিংহ বিভাগে রেডিওথেরাপি মেশিন প্রয়োজন ১৫টি। একটি থাকলেও সেটি এক দশক ধরে অচল। খুলনা বিভাগে ২১টি মেশিন প্রয়োজন, একটি প্যাকেট অবস্থায় পড়ে আছে দশ বছরের বেশি সময় ধরে।
চট্টগ্রাম বিভাগে ক্যান্সার রোগীদের জন্য রেডিওথেরাপি মেশিন দরকার ৪১টি। আছে তিনটি মেশিন। সরকারি হাসপাতালে রয়েছে একটি। সিলেট বিভাগে দরকার ২৬টি, আছে মাত্র একটি। রাজশাহী বিভাগে প্রয়োজন ২২টি, আছে মাত্র চারটি। এর মধ্যে সরকারি দুটি।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. এ এফ এম কামাল উদ্দিন  বলেন, আমরা যদি অন্তত ৫০ শতাংশ রোগীকে রেডিওথেরাপি দিতে চাই, তাহলে ৯৩টা মেশিন লাগবে। যা আছে, এর বাইরে নতুন ৬২টা মেশিন প্রয়োজন।  সমস্যা হলো অনেক জায়গায় মেশিন আছে, চলে না। ৫০ কোটি টাকার মেশিন মেরামতের বরাদ্দ নেই, মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় লোকবল সংকট রয়েছে, আবার লোকবল আছে প্রশিক্ষণ নেই। সরকার মেশিন কিনেছে, কিন্তু চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্টদের প্রশিক্ষণে অর্থ বরাদ্দ নেই। 
জনবল দরকার কয়েক গুণ : ক্যান্সার চিকিৎসায় তিন ধরনের জনবল দরকার হয়। অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট ও টেকনোলজিস্ট। চিকিৎসায় ২৫০ রোগীর জন্য প্রয়োজন একজন রেডিও অনকোলজিস্ট। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রয়োজন ৩৬৮ জন অনকোলজিস্ট, আছে ২৫০ জন। ঘাটতি ১১৮ জন রেডিও অনকোলজিস্টের। এ ছাড়া ৪০০ রোগীর জন্য একজন ফিজিসিস্টের প্রয়োজন। সে অনুযায়ী প্রয়োজন ২৩০ জন মেডিক্যাল ফিজিসিস্টের। মেডিক্যাল ফিজিক্সে আছে ৭০ জন, ঘাটতি ১৬০ জনের। ১২৫ জন রোগীর জন্য টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন একজন। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের ৭৩৭ জন রেডিয়েশন টেকনোলজিস্ট লাগে। টেকনোলজিস্ট দরকার ৭৩৭ জন, আছে ১১৫ জন, ঘাটতি ৬৬২ জনের।
নিম্ন আয়ের অন্য দেশগুলোতেও একই সংকট : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সালে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু ২৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। এ জন্য প্রতিবছর ১.৫ মিলিয়ন ক্যান্সারে মৃত্যু কমানো দরকার। কিন্তু এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। কারণ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ক্যান্সার চিকিৎসায় সক্ষমতা আছে মাত্র ৫ শতাংশ। অথচ ৮০ শতাংশ ক্যান্সার রোগী এসব দেশে বাস করে।
গবেষকরা জানান, আগামী ২০ বছরে যদি প্রয়োজনীয় রেডিওথেরাপির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ১০ মিলিয়ন মানুষের জীবন রক্ষা করা যাবে।