
বিভিন্ন জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধকের (টিকা) সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে কুকুর, শিয়াল, বিড়ালসহ বিভিন্ন পশুর কামড়ে আহতরা বিপাকে পড়েছেন। তারা বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। নির্ধারিত সময়েও অনেকেই টিকার ডোজ সম্পন্ন করতে পারছেন না। এতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক সব সময়ই কম থাকে। গত কয়েক মাস ধরে সংকট চলছে। আবার যা বরাদ্দ পাওয়া যায়, এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।
ভুক্তভোগীরা জানান, কুকুর ও বিড়ালে কামড়ানোর পর চিকিৎসক ভ্যাকসিন নিতে বললেও কোথাও তা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক খুঁজেও না পেয়ে কেউ কেউ ঢাকায় এসে খোঁজ করছেন। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। প্রেসক্রিপশন থাকলেও ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
ফার্মেসির ওষধু বিক্রেতারা জানান, কুকুর-বিড়ালের কামড়ের জন্য ব্যবহৃত এই ভ্যাকসিন এখন বাজারে নেই বললেই চলে। প্রতিদিন বহু মানুষ খোঁজ করছেন, কিন্তু সরবরাহ না থাকায় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ৫০০ টাকার টিকা এখন অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে।
বরিশালে চার মাস ধরে নেই জলাতঙ্কের টিকা
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে চার মাস ধরে জলাতঙ্কের টিকা নেই। এ কারণে বিভিন্ন পশুর কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের বাইরে থেকে বেশি দামে টিকা কিনতে হচ্ছে। একটি টিকা ৫০০ টাকায় কিনে চার জনে ভাগ করে দিচ্ছেন। বিভিন্ন সময় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ টাকা পর্যন্ত কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা।
রোগীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ সময়ই সরকারি হাসপাতালে টিকা থাকে না। যার কারণে বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে বেশি দামে কিনতে হয়।
বিড়ালের কামড়ে আহত সাজু ও শাকিল জানান, আক্রান্ত হওয়ার পর তারা বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে টিকা নিতে যান। বলা হয় টিকা নেই। বাইরে থেকে নিতে। সেইসঙ্গে টিকার সঙ্গে নিডেলও আনতে বলা হয়।
নগরীর কাঠপট্টি এলাকার বাসিন্দা মো. শাকিল বলেন, ‘এক মাস আগে আমাকে বিড়াল কামড় দিয়েছিল। ওই সময় বরিশাল নগরীর কোনও ফার্মেসিতে টিকা পাই নাই। সরকারি হাসপাতালের নার্সরা বলেছেন, চার মাস ধরে সরবরাহ নেই। দিতে হলে ফার্মেসি দিয়ে কিনে আনতে হবে, সঙ্গে নিডেলও আনতে হবে। এ অবস্থায় রোগীদের কিছুই করার নেই। বাধ্য হেয় ঝালকাঠি থেকে দেড় হাজার টাকায় টিকা কিনে দিতে হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের এক নার্স জানান, প্রতিদিন গড়ে শতাধিক রোগী টিকা নিতে আসেন। কিন্তু চাহিদার চার ভাগের একভাগ দেওয়া যায় না। কারণ সরবরাহ নেই। কিছু বরাদ্দ পেলে এক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এ কারণে বেশিরভাগ রোগী পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় অফিসে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা পাওয়া যাবে।’
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে চাহিদার বিপরীতে চার ভাগের এক ভাগও টিকা পাওয়া যায় না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, ‘এ বছর চাহিদামাফিক পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। তাতে ভুক্তভোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হবে না। কেন্দ্রীয় অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সে বিষয়ে কথা হয়েছে।’
আক্রান্তরা বাইরে থেকে চড়া দামে টিকা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের সহকারী পরিচালক ডা. শেখ শফিকুর ইসলাম জানিয়েছেন, বিভাগের ছয় জেলায় মাসিক চাহিদা ৯ হাজার ৭৪০ ভায়াল। বছরে ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৮০ ভায়াল। স্বাস্থ্য অধিদফতর এখন পর্যন্ত এই চাহিদা পূরণ করতে পারেনি। যে কারণে বরিশাল অঞ্চলে টিকার সংকটও কাটেনি।
রাঙামাটিতেও একই অবস্থা
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে গত চার মাস ধরে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধকের সংকট চলছে। সরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন জেলা ও জেলার বাইরে থেকে আসা শত শত রোগী। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষ, যারা বিনামূল্যে সেবার আশায় সরকারি হাসপাতালে আসেন, তারা বাধ্য হয়ে চড়া দামে বাইরে থেকে টিকা কিনছেন। খরচ বাঁচাতে অনেক ক্ষেত্রে চার জন রোগী মিলে একটি ভায়াল কিনে ভাগ করে নিচ্ছেন।
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিকার জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না। অনেকে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিপাকে আছেন তারাও। ডিসেম্বর থেকে দেখা দিয়েছে সংকট। আগে আক্রান্তদের সরকারিভাবে বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হলেও গত চার মাস ধরে বন্ধ এই সেবা। ফলে সংকটে নিরুপায় হয়ে বাইরে থেকে কিনে চার জন মিলে টিকা ভাগ করে নিচ্ছেন।
ভ্যাকসিন নিতে আসা শোভা রানী চাকমা বলেন, বাসার বিড়ালের নখের আঁচড় লেগেছে। হাসপাতালে এসে জানলাম টিকা নেই, বাইরে থেকে কিনে আনলে তারা পুষ করে দেবে।
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতাল মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট নিখিল প্রিয় চাকমা বলেন, ‘গত ডিসেম্বর মাস থেকে টিকা ঢাকা থেকে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এজন্য রোগীদের দেওয়া যাচ্ছে না।’
হাসপাতালের তথ্যমতে, জেলা ও জেলার বাইরে থেকে প্রতিদিন হাসপাতালে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন আসেন। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ক্রয় করার নির্দেশনা থাকলেও বাজেট স্বল্পতায় কেনা হয় না। এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি জেলার সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা।
কুড়িগ্রামেও সংকট
কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে টিকা আছে। তবে অপ্রতুল। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নিস্বর্গ মেরাজ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে কিছু টিকা পাওয়া গেছে। তবে অপ্রতুল। সরকারিভাবে বরাদ্দ চেয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে।’
কুকুর-বিড়াল কামড়ালে টিকা নিতে হয়। আঁচড় দিলে যদি রক্ত বের হয় তাহলেও টিকা নিতে হয়। কিন্তু যদি রক্ত বের না হয় তাহলে টিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কুড়িগ্রামে বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্ত রোগী বেশি আসেন। তাদের মধ্যে অনেকে আসেন যাদের আঁচড়ে রক্ত বের হয় না। এমন রোগীর টিকা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আতঙ্কিত হয়ে তারাও টিকা নেন। ফলে টিকার চাহিদা বেশি।
রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে গত চার মাস ধরে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধকের সংকট চলছে
জেলার সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আপাতত সবকটি টিকাদান কেন্দ্রে টিকার সরবরাহ রয়েছে। আমাদের কাছেও কিছু মজুত আছে।’
হঠাৎ সংকট দেখা দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সিভিল সার্জন বলেন, ‘কুকুরের সংখ্যা বেড়েছে। অনেকে বাড়িতে বিড়াল পালন করছেন। কুকুর-বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে টিকার চাহিদা বেড়েছে। আরও টিকার চাহিদা জানিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বার্তা দিয়েছি।’
গাজীপুরেও সংকট চলছে
শ্রীপুরে ছয়-সাত মাস ধরে জলাতঙ্ক টিকার সংকট চলছে। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা টিকা নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা বিজন মালাকার জানান, জলাতঙ্কের একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ হলো সময়মতো টিকা নেওয়া। কিন্তু বাজারে সংকট থাকায় অনেকেই নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করতে পারছেন না। তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ স্বাভাবিক
গত মাসে নারায়ণগঞ্জে জলাতঙ্কের টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। ফলে সংকট কিছুটা কেটে গেছে। তবে গত চার মাস ধরে সংকট ছিল। সে সময় বাইরে থেকে চড়া দামে কিনে দিতে হয়েছে রোগীদের।
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে আসা সেলিম আহমেদ বলেন, ‘কয়েকদিন আগে কুকুর কামড় দেওয়ার ফলে হাসপাতালে গিয়ে টিকা নিয়েছি। গত মাসের মাঝামাঝিতে আমার এক আত্মীয় টিকা নিতে গিয়েছিল। কিন্তু সংকটের কারণে তখন নিতে পারেনি। পরে বাইরে থেকে কিনে দিতে হয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন আমাদের হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকার সংকট নেই। সব রোগী টিকা পাচ্ছেন। সম্প্রতি ৪০০ টিকা পেয়েছি। আপাতত সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। কিছুদিন আগে সংকট ছিল। সে সময় আমাদের দেওয়া হয়নি। এ কারণে আমরা রোগীদের দিতে পারিনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে যে সংকট ছিল, তা এখন নেই। আশা করি, আগামীকে এ ধরনের সংকট তৈরি হবে না।’
নোয়াখালীতে সংকট নেই
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রাজীব আহমেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জলাতঙ্ক টিকা শেষ হওয়ার পরপরই আমাদের হাসপাতালে এম এস আর বাজেট থেকে ৫ লাখ টাকার টিকা কিনেছি। সেখানে আমরা ১ হাজার ১৪০টি ডোজ টিকা কিনতে পেরেছি। আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি টিকা ব্যবহার করা হয়। সংকট নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত এসব মজুত আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এগুলো রোগীদের সরবরাহ করতে পারবো।’
জেলা সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের নোয়াখালী জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও পর্যাপ্ত পরিমাণ জলাতঙ্কের টিকা আছে। সংকট নেই।’
সাতক্ষীরার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে টিকা নেই
প্রতাপনগরের অশোক কুমার বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে টিকা নেই। জেলা শহরে গিয়ে টিকা নিতে হয়। আবার জেলা শহরের হাসপাতালে সময়মতো না গেলে পাওয়া যায় না।’
সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ‘বর্তমানে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে জলাতঙ্কের পর্যাপ্ত টিকা আছে। এ ছাড়া চাহিদা মেটাতে নতুন করে আরও ৫০০ টিকার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে মাসে গড়ে ৬৫০ ভায়াল টিকার প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ভায়াল থেকে পাঁচ জনকে দেওয়া হয়।’
এতদিন উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ না থাকায় ছয় উপজেলা থেকে রোগীদের জেলা সদরে আসতে হতো। সংকটের কারণে এতদিন আমরা উপজেলার হাসপাতালগুলোতে টিকা চালু করতে পারিনি। তবে সম্প্রতি আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এখন থেকে উপজেলা পর্যায়েও জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হবে।’
বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন
সত্র: বাংলা ট্রিবিউন