
ঢাকা নগরে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি কাঠামোগত নগর স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা প্রতিক্রিয়া দেখাই বা ব্যবস্থা নিই। এর মধ্যে থাকে ফগিং, লার্ভিসাইডিং, জরুরি ক্যাম্পেইন। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অধরাই থেকে যায়। এই পটভূমিতে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক নীতিনির্ধারণই হতে পারে ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে গত দুই বছরের মশা সার্ভিলেন্স তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এসেছে। দেখা গেছে, ঢাকায় ডেঙ্গু বাহক এডিস মশার সর্বোচ্চ উৎপাদন হয় তিনটি নির্দিষ্ট উৎস থেকে। ফ্লাডেড ফ্লোর বা বেজমেন্ট (৪২.২৭%), বহুতল ভবনের বেজমেন্ট ও গাড়ি পার্কিং (১৬.৮০%) এবং প্লাস্টিক ড্রাম (১৪.৭৪%)। অর্থাৎ এই তিন উৎসেই প্রায় ৭৪ শতাংশ এডিস মশার জন্ম হয়। এই গবেষণার তথ্য একটি সুস্পষ্ট মশক বা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ দিকনির্দেশনা দেয়। যে দেশের সম্পদ বা অর্থ সীমিত, সেই দেশে সম্পদ সবখানে সমানভাবে ব্যয় না করে তথ্য-উপাত্ত থেকে পাওয়া প্রজননস্থলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিলেই সর্বোচ্চ ফল পাওয়া সম্ভব।
প্রথমত, দ্রুত নগরায়ণের ফলে ঢাকার অনেক ভবনের নিচতলা বা বেজমেন্টে পানি জমে থাকে। এই জমে থাকা পানি এডিস মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই স্থানগুলো সাধারণত নজরদারির বাইরে থাকে। এসব জায়গায় মশার প্রজনন কমাতে ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা শহরে গাড়ি ধোয়ার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় বেশির ভাগ সময় আমরা দেখতে পাই, বহুতল ভবনের বেজমেন্ট ও গাড়ি পার্কিং এলাকায় এই কাজ করা হয়। আধুনিক নগরজীবনে এই স্থানগুলো অপরিহার্য হলেও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে এগুলো এডিস মশার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এখানে সিটি করপোরেশন, রাজউক এবং ভবন মালিকের মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। যেখানে নিয়মিত তদারকি, পানি জমে থাকা প্রতিরোধ এবং প্রয়োজনে জরিমানার বিধান থাকবে।
তৃতীয়ত, প্লাস্টিক ড্রাম গৃহস্থালির পানি সংরক্ষণের একটি প্রচলিত মাধ্যম। ঢাকার অনেক এলাকায় অনিয়মিত পানি সরবরাহের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে পানি জমা রাখে। তবে এই ড্রামগুলো সঠিকভাবে ঢেকে না রাখলে তা মশার প্রজননের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। এখানে আচরণগত পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির এসব পাত্র যদি সপ্তাহে এক দিন ভালো করে ডিটারজেন্ট বা সাবান দিয়ে ধুয়ে আবার পানি ভরা হয়, তাহলে মশার প্রজনন সেখানে হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। এই জায়গায় প্রজনন ঠেকাতে ঢাকনা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি তদারকি জোরদার জরুরি।
এই তিন উৎস ঘিরে যদি ‘টার্গেটেড ভেক্টর কন্ট্রোল’ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়, অর্থাৎ নির্দিষ্ট স্থানভিত্তিক লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, পানি অপসারণ এবং প্রজননস্থল শূন্যে নামিয়ে আনা যায়, তাহলে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ডেঙ্গু ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এতে সময়, অর্থ এবং মানবসম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
এতে শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; জনসম্পৃক্ততা এখানে একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ফল আসা সম্ভব নয়। স্কুল, মসজিদ, স্থানীয় ক্লাব এবং সোসাইটিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে একটি ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স’ হিসেবে নয়; বরং একটি নিয়মিত, তথ্যনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম হিসেবে দেখতে হবে। মশা সার্ভিলেন্স থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা নেওয়া এবং তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করলেই শুধু ঢাকা শহরকে ডেঙ্গুমুক্ত করা সম্ভব।
লেখক : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।